4thPillar


ঘরোয়া পকেট যন্ত্রে কি কেকে-র মৃত্যু আটকানো যেত?

সুস্মিতা ঘোষ | 08-06-2022June 3, 2023
ঘরোয়া পকেট যন্ত্রে কি কেকে-র মৃত্যু আটকানো যেত?

সংগীতশিল্পী কেকে ওরফে কৃষ্ণকুমার কুন্নাথের অসময়ে চলে যাওয়াতে তাঁর অতি বড় শত্রুও শোকে মুহ্যমান। ঘটনাপ্রবাহ এমনই যে, অনেকেই দোষী খুঁজছেন- অমুকের দোষে কেকে অসুস্থ হলেন, যেন কাউকে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়। এর মধ্যেই নজরে পড়ল একটা খবর- পকেটে রাখুন ছোট্ট ইসিজি মেশিন এবং মোবাইলের মাধ্যমে আসন্ন হৃদরোগের সংকেত পেয়ে বাঁচুন। সবাই জানে, হৃদরোগ চুপিচুপি আসে, বাইরে থেকে লক্ষণ বোঝা যায় না- এই যেমন কেকে’কে স্টেজের ওপর সবাই চনমনে দেখেছিল, সুর নড়েনি, দম পড়েনি, আনন্দ বিতরণে এতটুকু ঘাটতি ছিল না, সেই কেকে কিনা এক ঘন্টার মধ্যে হৃদরোগে শেষ! সবার মোটামুটি এ-ও ধারণা আছে, ইসিজি থেকে হৃদরোগ নির্ণয় করা যায়। তাহলে কি পকেটের মধ্যে ইসিজি মেশিন থাকলেই ধরতে পারা যাবে কখন হৃদরোগ হানা দেবে? না পুরোটাই ব্যবসায়িক চাল- জনগণের আবেগের ফাঁকে দু’পয়সা করে নেওয়া?  এই প্রতিবেদনটিতে সেই বিষয়েই আলোচনা করলাম।

 

হার্টের অসুখ

আমরা সবাই জানি যে হার্ট বা হৃদযন্ত্র আমাদের শরীরে অপরিহার্য অঙ্গ, কাজেই সেখানে কোনও অসুখ বা সমস্যা থাকা মানেই প্রাণ সংশয়। এখন হৃদযন্ত্রের কাজ কী? হৃদযন্ত্র হল একটা পাম্প- ঠিক জল তোলার পাম্পের মতো, এবং জলের পাইপের মতো এর সঙ্গেও পাইপ লাগানো থাকে, যেগুলোকে আমরা শিরা ও ধমনী বলি। একটা পাম্প কখন কাজ করে না? এর কয়েকটা কারণ হতে পারে:

1) পাইপে ময়লা জমে ‘চোকড’ হয়ে গেলে

2) পাম্পের মধ্যেই ময়লা জমলে

3) পাম্পের নিজের গঠন বা structure ভেঙেচুরে বা ফেটে গেলে।

 

ঠিক এই ঘটনাগুলিই হৃদযন্ত্রের ক্ষেত্রে ঘটলে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ প্রাণ সংশয় হতে পারে। কিন্তু হৃদযন্ত্র খারাপ হওয়ার এই সব কারণগুলো ঘটে কীভাবে? প্রথম কারণ অবশ্যই বয়স। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পাইপে বা পাম্পে যেমন ধীরে ধীরে ময়লা জমে, শিরা-ধমনী এমনকি হৃদযন্ত্রেরও ভেতরে জমা হতে থাকে ফ্যাট বা মেদ। বদভ্যাসের ফলে এই ফ্যাট জমা ত্বরান্বিত হয়। এ ছাড়া বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হৃদযন্ত্রের কলকব্জাও দুর্বল হতে থাকে এবং এখানেও বদভ্যাস সেটা ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া জন্মসূত্রে (congenital) কিছু কিছু মানুষের হৃদযন্ত্রে সমস্যা থাকতে পারে, বা জিনগত কারণে হৃদযন্ত্র দুর্বল হতে পারে সাধারণের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি। অনেক ইনফেকশনও হৃদযন্ত্রে ঘা মেরে যায়। জানা গেছে যারা কোভিড আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের অনেকেরই হৃদযন্ত্রে কিছু কিছু সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

 

এই যে পাম্প, পাইপ লাইন, শরীরে তার ভূমিকা কী? অবশ্যই রক্ত সংবহন- রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, তার মধ্যেকার পেশী, কলা (টিস্যু) এবং কোষগুলিতে খাদ্য এবং অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। ধমনীর পথ রুদ্ধ থাকলে অক্সিজেনের অভাব হতে থাকে পেশীতে. যাকে বলে hypoxia । এই কারণে শরীরের ওপর অংশের, বিশেষ করে বাঁ দিকে, যেদিকে আমাদের হৃৎপিণ্ডটা থাকে, সেদিকের হাত, চোয়াল ইত্যাদির পেশী শক্ত হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ডে চাপ পড়ে বলে বুকে ব্যথা করতে থাকে। এই চাপ আবার পেটের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে গ্যাস, অম্বলের মতো উপসর্গও দেখা যায়। এই সবকটি উপসর্গ অন্য সাধারণ এবং কম বিপজ্জনক কারণেও হতে পারে, কিন্তু হৃদরোগ সন্দেহে অবিলম্বে হাসপাতালে যাওয়া উচিত। হয়তো বলবেন, এসব কথা তো সবাই জানে। অনেকেই জানে, অনেকে জানে না, আবার অনেকে জেনেও ভুলে যায়। আসছি সে কথায়।

 

হার্টের স্বাস্থ্য বা অসুখ কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

 

এটাও অনেকেই জানেন, কারণ এগুলোকে অনেককেই করাতে হয়েছে। কিন্তু তা-ও বলছি, কারণ এই টেস্টগুলি কোথায় নির্ভরযোগ্য আর কোথায় সীমিত সেটা বেশিরভাগই জানে না, কিন্তু জানা অত্যন্ত জরুরি।

 

ক) Electrocardiogram (ECG): আমাদের হৃদযন্ত্রের যে স্পন্দন, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের পেশির সংকোচন ও প্রসারণের ফলে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, সেটাকে রেকর্ড করলে একরকম রেখচিত্র আসে। হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকলে একরকম ছন্দোবদ্ধ চিত্র আসে, হৃদযন্ত্র ঠিক ছন্দে না চললে সেই চিত্র থেকে স্খলন দেখা যায়। এটুকু বোধহয় সবাই জানে। কিন্তু কতকগুলো ভীষণ জরুরি তথ্য সবার জানা দরকার:

 

1) ইসিজি-র রেখচিত্র যে কেউ পড়ে অর্থ উদ্ধার করে সুস্থতা অসুস্থতা বিচার করতে পারে না। ডাক্তারি পড়া ছাত্ররাও শিক্ষার প্রথম কয়েক বছর পারে না, এবং যে সব ডাক্তারকে নিয়মিত ভাবে হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করতে হয় না, তাঁরা অনেকেই এই দক্ষতাটিকে বিস্মৃতির অতলে নিমজ্জিত করেছেন।

2) প্রায় 30 শতাংশ হৃদরোগীর ক্ষেত্রে হৃদরোগের শুরুতে ইসিজি অসঙ্গতি বা আসন্ন হার্ট অ্যাটাক ধরতে পারে না।

3) আজকাল পকেট ইসিজি মেশিন বা ইসিজি মেশিন লাগানো রিস্ট ওয়াচ কিনতে পাওয়া যায়। অ্যাপলের ঘড়ি নাকি কারও হার্ট অ্যাটাকের পূর্ব সংকেত দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু এই একটা দু’টো কেস ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিতে যতটা কার্যকরী, বাস্তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে হৃদরোগের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হবে কিনা বিরাট প্রশ্ন থেকে যায়। তার একটা বিরাট কারণ হল ইসিজির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা, যেটা দু’নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হল কৃত্রিম মেধা বা artificial intelligence, যার দ্বারা ইসিজির ডেটার ব্যাখ্যা করে কে সুস্থ বা কে অসুস্থ বিচার করা হয়, তার নিজস্ব একটা বিরাট সীমাবদ্ধতা আছে। সেই সীমাবদ্ধতাটা কেমন, একটু বোঝাই। ধরা যাক একজন ভীষণ প্রাজ্ঞ ডাক্তার, শুধুমাত্র স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে, বা আড়চোখে ইসিজির রিপোর্ট দেখেই বলতে পারেন রোগীর কী অবস্থা (হ্যাঁ, এখনও এরকম কিছু হাতে গোনা ডাক্তার আছেন আমাদের দেশে)। এই অভিজ্ঞতা তাঁর এসেছে হয়তো বিশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে, যেখানে তিনি দিনে হয়তো কম করে কুড়িটা করে রোগী, অর্থাৎ বিশ বছর প্রায় দেড় লক্ষ রোগী দেখেছেন। আজকাল যে সব যন্ত্রকে বাজারে আনা হচ্ছে, তারা কোনওরকমে পাঁচ হাজার রোগীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে দেখাতে পারলেই ছাড়পত্র পেয়ে যায়, বেশির ভাগ সময়ে 100 -র চেয়েও কম রোগীর ওপরই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। যে কোনও ডায়াগনস্টিক যন্ত্রের দু’টো গুণ খুব জরুরী- sensitivity অর্থাৎ কত কম সিগনাল ধরতে পারার ক্ষমতা এবং specificity অর্থাৎ সুস্থকে সুস্থ এবং অসুস্থকে অসুস্থ হিসেবে নির্ণয় করার ক্ষমতা কতটা ঠিক - এই তথ্যটা সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় আড়াল করে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়। ওই যে, দু’নম্বর পয়েন্টে বললাম, প্রায় 30শতাংশ ক্ষেত্রে ইসিজি ধরতে পারে না রোগীর হার্ট অ্যাটাক হতে চলেছে- অর্থাৎ ভুল করে সেই যন্ত্র সুস্থ দেখাতে পারে। এইরকম 30শতাংশ ক্ষেত্রে এই সব wearable device কতটা নির্ভরযোগ্য কেউ বলতে পারবে না। সারাক্ষণ পরে আছি বলে সারাক্ষণ শরীরের ওপর নজরদারি চলছে, কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না, এই আইডিয়াটা অবশ্যই খুব আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রচুর দাম দিয়ে এরকম যন্ত্র কিনে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়ার মতো দিন আসেনি এখনও।

 

খ) Echocardiogram : এখানে শব্দোত্তর তরঙ্গের (ultrasound) মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ভিতরের ও বাইরের চেহারা দেখতে পাওয়া যায়। শুধু চেহারা নয়, রক্ত কীভাবে বেরোচ্ছে, ঢুকছে, কোথাও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে কিনা, হৃদযন্ত্রে কোথাও কোনওরকম ফাটল, বাধা আছে কিনা, সব দেখতে পাওয়া উচিত। তবে যত সূক্ষ্মতা বা যত খুঁটিনাটি দেখার প্রয়োজন হবে, তত উন্নত মানের যন্ত্রের প্রয়োজন এবং আলাদা আলাদা বিশেষত্বের একাধিক যন্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে। এই পদ্ধতি, যার চলতি নাম হল ‘ইকো’। এটি হল হৃদযন্ত্রের চিকিৎসার স্বর্ণমান অর্থাৎ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড। আজকাল পকেট ‘ইকো’ মেশিনও বেরিয়েছে, তাতে গুরুতর বিপদের আভাস কিছুটা পাওয়া যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে পাওয়া ছবির সঠিক ব্যাখ্যা করতে গেলে প্রয়োজন হয় অনেক দিনের এবং অনেক গভীর অভিজ্ঞতা। কাজেই ‘এরকম একটা যন্ত্র কিনে ফেললেই তো হয়’-তে কোনও কাজ হবে না। কারণ আপনি আমি হাজার চেষ্টা করেও মাথামুণ্ডু বুঝতে পারব না, বরং অহেতুক দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। একমাত্র ডাক্তারেরা এই যন্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন বা নিজস্ব ছোট ক্লিনিক বা চেম্বারে রাখতে পারেন।

 

গ) রক্ত পরীক্ষা (Cardiac Marker Tests): হৃদযন্ত্রের দেওয়াল বা পেশী নানা ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এই প্রোটিনগুলি সাধারণত সুস্থ অবস্থায় রক্তে বেশি মাত্রায় থাকে না। হৃদ-পেশীতে কোনওরকম ফাটল ধরলে, যাকে বলা হয় Acute Myocardial Infarction, এই প্রোটিনগুলি রক্তস্রোতে লিক করতে থাকে, এবং এদের মাত্রা বেড়ে যায়- যেটা টেস্টের মাধ্যমে বোঝা যায় বা মাপা যায়। এই প্রোটিনগুলিকে কার্ডিয়াক মার্কার বলা হয়। বেশি প্রচলিত কার্ডিয়াক মার্কারদের মধ্যে পড়ে Troponin T (TnT), Troponin I (TnI), Creatine Kinase (CK) বা Muscle Brain Creatine Kinase (CPK-MB)এবং Myoglobin। হৃদপেশীতে ক্ষত হলে এরা নিজেদের আণবিক আকার অনুযায়ী আগে পরে বেরোতে শুরু করে- ঠিক যেমন দেওয়ালে ফাটল ধরলে প্রথমে ঝুরঝুর করে বালি ঝরে, তারপর ছোট টুকরো, এবং তারপরে বড় চাঙড় খসে। পেশীতে ক্ষত হলে প্রথমে মায়োগ্লোবিন দেখা দেয় রক্তস্রোতে, তারপরে CPK-MB, তারপরে ট্রপনিনেরা। পনেরো কুড়ি বছর আগে মায়োগ্লোবিন এবং CPK-MB -র টেস্ট করা হত, এবং তারপর এল ট্রপনিন টেস্ট। কিন্তু এরা সবাই বিশেষ করে মায়োগ্লোবিন, অন্য পেশীতে, যেমন হাত পায়ের পেশীতে বহুল পরিমাণে উপস্থিত। সেই কারণে হাত পায়ের পেশীতে ক্ষত, যা খেলাধুলার সময়ে হামেশাই হয়ে থাকে, তার জন্যেও রক্তস্রোতে এদের মাত্রা বেড়ে গিয়ে হৃদরোগের সম্বন্ধে ফলস অ্যালার্ম দিতে পারে। হৃদপেশীতে আবার এক বিশেষ ধরনের ট্রপনিন থাকে, যাদেরকে cTnT ও cTnI বলা হয়ে থাকে (c=cardiac) যারা হাত পা ইত্যাদি অন্য অঙ্গের পেশীতে থাকে না। বছর দশেক হল cTnT এবং বছর পাঁচেক হল cTnI টেস্ট বাজারে এসেছে, এবং কোভিডের যেমন র্যাবপিড টেস্ট হয়, সেই রকম ফরম্যাটের টেস্ট বহুল প্রচলিত।

 

এখানে একটা জরুরি কথা বলা দরকার। ট্রপনিন টেস্টের ফেরিওয়ালাদের হাত এতই লম্বা, যে হার্ট চেক আপের প্রোটোকলের মধ্যে এটি অন্যতম হয়ে ঢুকে গেছে। এর মধ্যে একটা বিরাট বিপজ্জনক ব্যাপার আছে। আগেই বলেছি, ট্রপনিন আকারে বড় হওয়ার জন্য হার্ট অ্যাটাক শুরু হওয়ার 6 ঘন্টা বা তারও বেশি পরে এটি রক্তস্রোতে দেখা দেয়। এই কারণে হার্ট অ্যাটাক শুরু হওয়ার পর কারও কারও কিছু কিছু শারীরিক অস্বস্তি অনুভূত হলেও প্রথম চার পাঁচ ঘণ্টা তাদের ট্রপনিন টেস্টের ফল নেগেটিভই আসে সাধারণত। বেশ কিছু কেস আমি ব্যক্তিগত ভাবে জানি, যেখানে ট্রপনিন টেস্টের ফল নেগেটিভ আসার কারণে ‘কিছু হয়নি’ বলে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার পরে আবার হাসপাতালে ফেরত আসতে হয়েছে, এবং তখন ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে আরও বড় মাপের।

 

তাহলে কি ট্রপনিন টেস্টের কোনও মূল্য নেই? অবশ্যই আছে। সত্যিকারের হার্ট অ্যাটাক শুরু হলে সেই ক্ষত বাড়ছে কিনা বা সারছে কিনা সেটার একটা ভাল পরিমাপক এই টেস্ট। কিন্তু ঘোরতর অন্যায় হচ্ছে এই টেস্টকে সুস্থ না অসুস্থ তার পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করায়। অনেক চিকিৎসকই এটা জানেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রতিবাদ করতে পারেন না। অনেক উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষ, যাঁরা নিজেদের সচেতন মনে করেন, তারা এই টেস্টের নাম জানেন, এবং নেগেটিভ এসেছে জেনে সতুষ্ট থাকেন। এমন দিনও আসতে পারে, যখন ব্যবসায়ীরা ট্রপনিনের হোম টেস্ট বিক্রি করাবে এই ‘সচেতন’ শ্রেণীকে, এবং হার্ট অ্যাটাকের প্রথম কয়েক ঘন্টা, যার প্রতিটি মিনিট সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য মূল্যবান, নষ্ট হয়ে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে।

 

হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আরও নানা টেস্ট আছে, কিন্তু সেগুলো শুধু হাসপাতালে বা বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হয়। আমি শুধু সেই টেস্টগুলোর কথাই লিখলাম, যেগুলো পকেটে ঢুকে স্ব-নির্ণয় অর্থাৎ self diagnosis এবং স্ব-চিকিৎসা প্রমোট করাতে পারে।

 

কেকে কাণ্ডের কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা:

এখানে যে ব্যাখ্যাগুলি লিখছি, সবই খবরের কাগজে প্রকাশিত কেকে সম্বন্ধে নানা বর্ণনার থেকে  অনুমিত। এই বর্ণনা ভুল হলে আমার অনুমানও ভুল হতে পারে। একটি কাগজে প্রকাশিত ওঁর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, ওঁর fatty heart ছিল- হৃৎপিণ্ড ফ্যাট জমে প্রায় সাদা হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার অন্য একটি কাগজ বলছে ওনার fatty liver ছিল। Fatty হার্টই হোক বা লিভার, কখনও হঠাৎ ঘটে না। বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে ঘটে, এবং অবশ্যই হৃৎপিণ্ডের অথবা লিভারের ছবি তোলে যে সব টেস্ট, যেমন ইকো, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়। হৃৎপিণ্ডে বা লিভারের বাইরে ফ্যাট জমা মানেই হৃদরোগ ডায়াবেটিস এবং আরও অনেক মারাত্মক অসুখের প্রবণতা খুব বেড়ে যাওয়া।

 

উনি কি তাহলে সেলেব্রিটি হয়েও চেক আপ করাতেন না?

 

কোনও একটি সংবাদমাধ্যমে শুনেছি, সেই দুর্ভাগ্যজনক দিনটির সকালে ওঁর বাঁ হাতে আর বাঁ কাঁধে ব্যথা হচ্ছিল এবং উনি প্রচুর অ্যান্টাসিড খেয়েছিলেন। এখনকার দিনে প্রচুর সচেতন মানুষ জানেন যে, heartburn অর্থাৎ অম্বল এবং heart অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণগুলি এক, এবং বাঁ হাত কিংবা বাঁ কাঁধের ব্যথা অনেক সময়ে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। (একটি সংবাদমাধ্যম hypoxia -র কথাও তুলেছে)। চল্লিশের ওপর বয়সীদের, বিশেষ করে 45-60 বছর বয়সের মানুষদের মারাত্মক হৃদরোগের সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি। প্রচুর মানুষই রজ্জুতে সর্পভ্রম করে অম্বলের জ্বালা বা বুকে ব্যথার জন্যে হাসপাতালে ভিড় করে। ভিড় করুক কিন্তু বলে না, better safe than sorry। কেকে কি সেই সচেতন মানুষদের দলে পড়তেন না?

 

গায়ক অভিজিতের বয়ানে আরও কিছু নজর করার মতো কথা খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। ‘’কেকে নেশা করতেন না, নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, ফিট ছিলেন, স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন, খাওয়া দাওয়া মেপে করতেন, কু-অভ্যাস ছিল না, আমরা দু’জনেই হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করতাম।‘’ এই কথাগুলো শুনলে অবশ্যই কিছু প্রশ্ন মনে জাগে। হোমিওপ্যাথি সম্বন্ধে একটা কথা বলব। আমি অনেক হোমিওপ্যাথকে জানি, যাঁরা এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড এই সমস্ত ছবি তোলার টেস্ট তো করাতে বলেনই, অনেক সময়ে ব্লাড টেস্টও করাতে বলেন। সচেতনতার একটা প্রশ্ন তো আগেই রাখলাম, এবার প্রশ্ন ওঠে, তাঁর চিকিৎসক কি সচেতন ছিলেন?

 

আর একটা সন্দেহ মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায়- সেলেব্রিটিরা জনমানসে শারীরিক ভাবে আকর্ষণীয় থাকার জন্য অনেক অদ্ভুত খাদ্য, অদ্ভুত ব্যায়াম করেন। এঁদের সবার ব্যক্তিগত ফিটনেস স্পেশালিস্ট থাকে কিনা আমার জানা নেই। থাকুক বা না থাকুক, ‘ফিটনেস’-এর যে অর্থ বাজার বিক্রি করে, তা স্বাস্থ্যসম্মত কিনা প্রশ্ন কি ওঠে না? বাজার ‘ফিটনেস’ বলতে মেদহীন চেহারা বোঝায়, ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়ার্কআউট বা নাচ ইত্যাদি করার ক্ষমতা বোঝায়। রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বোঝায় কি? শুরুতে বদভ্যাসের কথা তুলেছিলাম। ইংরেজি করলে poor lifestyle বোঝায়। হার্টের অসুখের কারণ fatty heartবা liver।  এর কারণ বলে ইন্টারনেট ঘাঁটুন- poor lifestyle বলে লিস্ট দেবে,অলস বা মন্থর জীবনযাত্রা, বহুল পরিমাণে স্নেহজাত ও শর্করাজাত খাদ্য আহার, ব্যায়ামের অভাব, শারীরিক পৃথুলতা এবং সব শেষে ছোট্ট একটি শব্দ ‘stress’! কেকে’র জীবনযাত্রা থেকে অনুমান করা যায়:

মন্থর জীবনযাত্রা- না

স্নেহ/শর্করা প্রধান আহার- জানা নেই

ব্যায়ামের অভাব- না

স্থূলতা- না

স্ট্রেস- হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

 

আজকের দিন যা দাঁড়াচ্ছে, সবাই প্রায় সেলেব্রিটি হতে চায়, এবং স্ট্রেসকে প্রায় অঙ্গের ভূষণ করার প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতারও একটা ছোঁয়াচে বা trickle down effect আছে, যাতে না চাইলেও প্রতিটি মানুষ এখন স্ট্রেস মহামারীতে আক্রান্ত। যেখানে প্রতিযোগিতা কমানোই একমাত্র ওষুধ, সেখানে স্ট্রেস কমানোর দাওয়াই হিসেবে ‘শান্তি’ বিক্রি হচ্ছে- সেলফ হেল্প জ্ঞান বিক্রি চলছে, এবং সেটাও প্রতিযোগিতামূলক! মুক্তি, ওরে মুক্তি কোথায় পাবি?

 

সবশেষে আমার নিজের দুপয়সার জ্ঞান দিই- কোভিডের দৌলতে Pulse oximeter এখন ঘরে ঘরে। যদি ঠিকঠাক কর্মক্ষমতার হয় (মনে রাখবেন বাজারের 90% যন্ত্রই বাজে)- তাহলে নিয়মিত ওটা ব্যবহার করে পালসটা এবং অক্সিজেন লেভেলটা মেপে নেবেন। মনে রাখবেন দু’টোই কমে যাওয়া অসুস্থতার লক্ষণ- হৃদযন্ত্রের গোলমালও হতে পারে। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে অবশ্যই ভুলবেন না। আর তা ছাড়া, যদি ভয় হয় হার্ট অ্যাটক হচ্ছে, 108 ডায়াল করতে দ্বিধা করবেন না।

 

(ড: সুস্মিতা ঘোষ ডায়াগনোরাইট-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং জৈব-রসায়নবিদ। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রাক্তন পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। সুস্মিতার ডায়াগনোরাইট সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত একটি স্টার্ট-আপ সংস্থাযার লক্ষ্য সকলের জন্য সুলভে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক ডায়গনস্টিক্স।)


New
বিদায় পিটি নায়ার: কলকাতার ইতিহাসবেত্তা
এগজিট পোল মিলে গেলেও যে প্রশ্ন উঠবেই
কংগ্রেস সেঞ্চুরি না করলে কে রুখবে বিজেপিকে?


Other Writings by -সুস্মিতা ঘোষ | 08-06-2022

// Event for pushed the video