4thPillar


বীর সাভারকর ১: স্বাধীনতা সংগ্রামী, নাকি আপসকামী?

রঞ্জন রায় | 30-01-2020May 26, 2023
বীর সাভারকর ১: স্বাধীনতা সংগ্রামী, নাকি আপসকামী?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্দামান সেলুলার জেলে গিয়ে একটি সেলের মধ্যে খানিকক্ষণ ধ্যানমুদ্রায় বসে রইলেন। গত শতাব্দীর গোড়ায় ওই সেলে প্রায় দশ বছর কাটিয়ে গেছেন ‘বীর’ সাভারকর, সে সময়ের এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক বন্দি যিনি একসময় ইংরেজ তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করতে অহিংস সত্যাগ্রহের চাইতে বন্দুক-পিস্তলের উপর বেশি ভরসা করতেন।

আমাদের  ছেলেমেয়েরা স্কুলে সাভারকরের কথা শোনেনি। এখন আবার সাভারকরের নাম একেবারে সামনের সারিতে। প্রথমে তাঁর ছবি সংসদের দেয়ালে স্থান পেল। সেলুলার জেলের নাম পালটে তাঁর নামে রাখা হল। এ বার দাবি তাঁকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হোক।

বিপরীতে বলা হচ্ছে উনি বৃটিশ সরকারের কাছে মাফিনামা দিয়ে আজীবন বৃটিশ বিরোধী কাজ না করার শর্তে ছাড়া পেয়েছিলেন। এ সব ছাড়াও তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের বিরোধিতা, হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং গান্ধীহত্যার ষড়যন্ত্রের যুক্ত থাকার অভিযোগ। এমন লোককে কি করে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া যায়?

এই সাদা-কালো চাপান-উতোরের মাঝখানে হারিয়ে গেছে ভারত ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের বাস্তবিক ধূসর রঙ। আমরা, এই স্বল্প পরিসরে, চারভাগে শুধু ঐতিহাসিক তথ্যগুলো তুলে ধরব। 

এই বর্ণময় মানুষটির সঙ্গে জড়িত চার-পাঁচটি প্রশ্ন নিয়ে আমরা কথা বলব, তবে এক এক করে।

 

১) উনি কি সত্যিই বৃটিশ সরকারের কাছে অসম্মানজনক মাফিনামা লিখেছিলেন?
২) ওঁর ‘হিন্দুত্ব’এবং হিন্দুরাষ্ট্রের ধারণা কি শক-হুনদল-পাঠান-মোগল সবাইকে বাদ দিয়ে?
৩) উনি কি ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন?
৪) উনি কি গান্ধী হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
৫) সংঘ পরিবারের বর্তমান ‘হিন্দুত্ব’ আন্দোলনের সাথে সাভারকরের ‘হিন্দুত্ব’ কতটুকু খাপ খায়?

প্রথম কিস্তি: সাভারকরের 'মার্জনা ভিক্ষা

সাভারকর কি সত্যিই বৃটিশ সরকারের কাছে ‘মার্জনা ভিক্ষা' করে চিঠি লিখেছিলেন? লিখলে কতবার? 

মারাঠি পত্রিকা ‘লোকসত্তা'র ২৭ মে, ২০১৮ সংখ্যায় দাবি করা হয়েছে যে উনি আদৌ কোন পিটিশন পাঠাননি। বা, পাঠালেও তাতে ‘মার্জনা ভিক্ষা' করেননি।1 

এ বিষয়ে সমস্ত দলিল (বৃটিশ এবং ভারতীয়) আজ সহজলভ্য। সাভারকর নিজে তাঁর এই ‘এবাউট টার্ন'কে ডিফেন্ড করে সেসময় গুচ্ছের লেখা লিখেছেন।
কতবার ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন? সাতবার।2

প্রথমবার সেলুলার জেলে আসার দু' মাসের মাথায় ৩০ অগাস্ট, ১৯১১, নির্জন কারাবাসের শাস্তির সময়। তারপর ২৯ অক্টোবর, ১৯১২; নভেম্বর ১৯১৩, সেপ্টেম্বর ১৯১৪। তারপর ১৯১৫ এবং ১৯১৭। শেষ দুটোতে আগের আগুনখেকো বিপ্লবী সাভারকর ওকালত করছেন হোমরুলের পক্ষে। তখন মন্টেগু -চেমসফোর্ড সংবিধান রিফর্মের কথা চলছে যা এলো ১৯১৯-এ। সাভারকর লিখছেন কোন দেশপ্রেমিকই ভাল সংবিধানের আওতায় কাজ করার সুযোগ পেলে সহিংস পথে বিপ্লবের কথা ভাববে না। এও বললেন যে আজ যখন ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মত প্রগতিশীল এবং নমনীয়  সংবিধান রয়েছে তখন বিপ্লবের কথা বলা ‘অপরাধ' (!)।3 

তাহলে দশবছর আগে গোখলে গান্ধী এরা কি দোষ করেছিলেন?

সাভারকরের শেষ পিটিশনের তারিখ ৩০ মার্চ, ১৯২০ যাতে উনি ছাড়া পাওয়ার পর সরকার যতদিন বলবে ততদিন কোন রাজনৈতিক কাজকর্মে যুক্ত হবেন না, একটি এলাকার বাইরে পা রাখবেন না এবং নিয়মিত থানায় হাজিরা দেবেন -- এই মর্মে মুচলেকা দিতে রাজি বলে জানালেন।4

 

 

সাভারকর তাঁর নিষ্ঠার পরিচয় দিতে লিখলেন যে, উনি  চাইছেন বৃটিশ ডোমিনিয়নের সঙ্গে  ‘ভালবাসা, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সাহায্যের বাঁধনকে শক্ত করতে' এবং রাজকীয় সনদে বর্ণিত সাম্রাজ্যের সঙ্গে সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিক পথে এক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।5

সাভারকর নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় লিখছেন যে উনি তখন জেলের মধ্যে অন্য বন্দীদের গোঁড়ামি ছেড়ে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেশের কাজ করতে বোঝাচ্ছেন, শিবাজী এবং কৃষ্ণের উদাহরণ দিচ্ছেন। অনেকে মানছে না । কিন্তু জেলের ভেতরে জীবন নষ্ট করে কি লাভ ? এই ছিল ওঁর যুক্তি।6

লক্ষণীয়, সাভারকর ১৯১২ থেকে ১৯১৪ পর্য্যন্ত কাজ করতে অস্বীকার করা এবং নিষিদ্ধ কাগজপত্র রাখার অপরাধে আটবার শাস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু পরের পাঁচবছর তাঁর আচার-আচরণ ছিল ‘ভেরি গুড'। ত্রৈলোক্য মহারাজের আন্দামানের স্মৃতিকথায় পাই বিনায়ক সাভারকরের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং মেধার প্রশংসা। কিন্তু তারপরই উনি লিখেছেন যে পাঁচবছর কারাবাসের পর সাভারকররা ‘নরমপন্থী’ হয়ে জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপোষ করে চলছেন, প্রতিবাদের থেকে দূরে থাকছেন এবং আন্দামান কর্তৃপক্ষের সুনজরে রয়েছেন।7

 

 

ইংলন্ডে থাকাকালীন ভারতে পিস্তল সরবরাহের দায়ে  এবং নাসিক শহরে ম্যাজিস্ট্রেট জ্যাকসন হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে আজীবন কারাবাসের সাজাপ্রাপ্ত বিনায়ক সেলুলারে রইলেন ১০ বছর। ১৯২১ সালের মে মাসে ওঁকে ভারতের জেলে নিয়ে আসা হল। ভগ্ন স্বাস্থ্য মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত বিনায়ক সাভারকর জেল থেকে পুরোপুরি ছাড়া পেলেন ৬ জানুয়ারি, ১৯২৪; কিন্তু নিঃশর্ত নয় । উনি পাঁচ বছর রত্নগিরি জেলার বাইরে পা দেবেন না এবং কোন রাজনৈতিক কাজকর্মে অংশ নেবেন না। শেষে সরকার জুড়ে দিল আরও দুটি।

এক, ওঁকে স্বীকার করতে হবে যে ‘হি হ্যাড এ ফেয়ার ট্রায়াল অ্যান্ড এ জাস্ট সেন্টেন্স' এবং দুই, ওঁকে সহিংস পদ্ধতির নিন্দা করে বিবৃতি দিতে হবে।
সাভারকর দুটি শর্তই মেনে নিয়ে মুচলেকা লিখে দিলেন।8

সাভারকর রত্নগিরিতে স্ত্রী-পুত্রকন্যা নিয়ে সংসার করতে এবং ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারে মগ্ন রইলেন। এবং তাঁর কলম ব্যস্ত রইল দুটো বিতর্কিত থিওরিকে ডিফেন্ড করতে – এক, জেলে পচে মরার চেয়ে যেকোন মূল্যে বাইরে এসে আন্দোলন করা; দুই, হিন্দু/মুসলমান দুটো আলাদা জাতি।

কিন্তু কুড়ি বছরেরও বেশি সময় সেলুলার এবং ময়ানমারের মান্দালয় জেলে থাকা এবং শত অত্যাচারেও কোনও মাফিনামা না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অনুশীলন দলের নেতার নাম ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী( মহারাজ)। তাহলে সেলুলার জেলের নাম ‘মহারাজ জেল’ হওয়াই যুক্তিযুক্ত নয় কি? মুশকিল, উনি বাঙালী এবং সমাজবাদী চিন্তার অনুসারী।9

---------------------------------------------


তথ্যসূত্র:
1 বৈভব পুরন্দরের লেখা সাভারকরের প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ “সাভারকর, দ্য ট্রু স্টোরি অফ দ্য ফাদার অফ হিন্দুত্ব”; পৃঃ ১৭২।  2 ঐ; পৃঃ ১৪৭-১৫০।
3 সাভারকর; “অ্যান ইকো ফ্রম আন্দামান”, পৃঃ ৭০-৭২।
4 “সাভারকর, দ্য ট্রু স্টোরি অফ দ্য ফাদার অফ হিন্দুত্ব”, পৃঃ ১৫৯।
5 “সোর্স মেটেরিয়ল ফর এ হিস্ট্রি অফ দ্য ফ্রীডম মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া”, ভল্যুম ২, বোম্বাই,; গভর্নমেন্ট অফ বোম্বে, ১৯৫৮; পৃঃ ৪৬৩-৭১।
6 সাভারকর; “মাই ট্রান্সপোর্টেশন অফ লাইফ”, পৃঃ ৩১৮।
7 ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (মহারাজ);“জেলে তিরিশ বছর”, পৃঃ ১২৪, ১২৬। এবং “সাভারকর, দ্য ট্রু স্টোরি অফ দ্য ফাদার অফ হিন্দুত্ব”, পৃঃ ১৫৬। 
8 বম্বে ক্রনিকল, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৪।
9 ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (মহারাজ), ‘জেলে তিরিশ বছর”।


 



New
ভোটই তো গোনা, মজন্তালী সরকারের ঢেউ গোনা তো নয়
কোভিশিল্ড বিতর্ক কি কোনও চিন্তার বিষয় ?
তাপদাহে তপ্ত দেশ, ভোট দেবেন কীভাবে?


Other Writings by -রঞ্জন রায় | 30-01-2020

// Event for pushed the video