4thPillar


ভুলে না যাই 25 জুন

বিতান ঘোষ | 24-06-2021June 24, 2023
ভুলে না যাই 25 জুন

"ইন্দিরা তেরে সুবা কি জয়, তেরে শাম কি জয়,

তেরে কাম কি জয়, তেরে নাম কি জয়।’

 

প্রায় 46 বছর আগে, দেশে জরুরি অবস্থা জারির ঠিক প্রাক্কালে ইন্দিরা-স্তুতিতে মগ্ন দেবকান্ত বড়ুয়ার উক্তি ছিল এমনই। তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক রাজনৈতিক স্রোত-প্রতিস্রোত বয়ে গেছে। কিন্তু ভক্ত আর ভক্তির আধিক্য কমেনি, উলটে ‘ভক্ত' শব্দটি দেশের রাজনৈতিক ব্যাকরণে পাকাপাকি ঠাঁই করে নিয়েছে। সেদিনের দেবকান্ত বড়ুয়াদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে, তাদের অনেকের মুখেই আস্ফালন, ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়', কিংবা ‘হর হর মোদী, ঘর ঘর মোদী'। দেশের অধুনা সাবালক গণতন্ত্রে "ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা, ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া' থেকে ‘মোদীই মুমকিন'-এ পৌঁছনোর রাস্তাটা কেমন ছিল, তা আগামীদিনে গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতেই পারে।

 
1971 সালে উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলী কেন্দ্রে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, সোশ্যালিস্ট পার্টির রাজনারায়ণকে হারিয়ে ইন্দিরা গান্ধী সাংসদ হন। তিনি অসাধু উপায়ে নির্বাচনে জিতেছেন, এই অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়। দীর্ঘ সময় মামলা চলার পর এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারক 1975 সালে রায় দেন, ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী জয় অবৈধ। বিচারক মূলত দু'টি কারণে এই রায় দিয়েছিলেন। কংগ্রেস সদস্য সমর্থক এবং বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকেই অবশ্য মনে করেছিলেন, দু'টি কারণ নেহাতই মামুলি, যার জন্য কারও সাংসদ পদ কেড়ে নেওয়া যায় না। সে অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ। ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে, শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, কিন্তু আইনি ফয়সালার আগে অবধি ইন্দিরার ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। কংগ্রেস সমর্থকদের একটা বড় অংশ চেয়েছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে ইন্দিরা নিজেই পদত্যাগ করে, নতুন করে নির্বাচনে যান। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা, দ্ব্যর্থহীন ভাবে জানিয়েছিল, ‘দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে ইন্দিরার পদত্যাগ করা উচিত।' কিন্তু কংগ্রেসের অন্দরে যে দু'জন মানুষ ইন্দিরাকে ‘গদি আঁকড়ে থাকার’ পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন ইন্দিরা পুত্র সঞ্জয় গান্ধী এবং বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।


পশ্চিমবঙ্গের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী দক্ষ আইনজীবী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের পরামর্শে এবং তাঁরই মুসাবিদা করা ঘোষণাপত্র অনুসারে, ইন্দিরার ‘নির্দেশে', রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের ‘নীরব সম্মতি'তে দেশে প্রথমবারের জন্য জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। সাল 1975, তারিখ 25 জুন। পরে শাহ কমিশনের কাছে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় অবশ্য জরুরি অবস্থা জারির যাবতীয় দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছিলেন। ইন্দিরা জরুরি অবস্থা জারির আগে এবং অব্যবহিত পরে এই ব্যাপারে কোনও ঘোষণা করেননি, এমনকি এমন সিদ্ধান্তের সপক্ষে ব্যাখ্যাও দেননি। অবশ্য তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জীবনীকার, পুপুল জয়াকরকে স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিলেন, ‘ক্রমবর্ধমান হিংসার' বিরুদ্ধে ‘দেশ জুড়ে প্রশান্তি' বজায় রাখতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘ 21 মাস দেশে যাবতীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কার্যত স্তব্ধ করেও, ইন্দিরা বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের পুনঃস্থাপন'-এর জন্যই নাকি এত কিছুর আয়োজন!


ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন। এখনও দেশের শাসকরা গণতন্ত্র বজায় রাখতেই কাশ্মীরের জনপ্রতিনিধিদের গৃহবন্দি করেন, নবতিপর প্রতিবাদী সমাজকর্মীকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাবন্দি করে রাখেন। সব আমাদের জন্য, সব গণতন্ত্রের জন্য! ঠিক যেমন ইন্দিরা গণতন্ত্রের জন্যই জরুরি অবস্থা জারি করার আগের রাতে দিল্লির সমস্ত সংবাদমাধ্যমের অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন, যাতে এই সংবাদ সারা দেশে পৌঁছনোর আগেই যাবতীয় বিধিনিষেধ জারি করে ফেলা যায়। এখন যেমন UAPA আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার করে সমস্ত বিরোধী কন্ঠকে রোধ করে দেওয়া হয়, তখনও তেমন MISA (Maintenance of internal security act) আইনে নির্বিচারে বিরোধীদের আটক করা হত। সেই সময় অনেকেই মজা করে বলতেন, এটি আসলে Maintenance of Indira and Sanjay Gandhi act! এই আইনবলে বিরোধী দল তো বটেই, কংগ্রেসের ইন্দিরা-বিরোধী গোষ্ঠীর কাউকেই রেহাই দেওয়া হত না। বৃদ্ধ, কিডনি বৈকল্যে কাবু জয়প্রকাশ নারায়ণও ইন্দিরার ‘গণতান্ত্রিক' দাওয়াই থেকে রক্ষা পাননি, তাঁকে হরিয়ানার এক সরকারি আবাসে বন্দি রাখা হয়।


ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না, তাই কারণে-অকারণে অবিরত নিজের ‘মনের কথা' বলে গেলেও, তাঁর সাত বছরের শাসনে তিনি একটাও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। সংবাদমাধ্যমকে এমন নিষ্প্রভ, দাসানুদাস করার চেষ্টা তো ইন্দিরাও করেছেন, প্রায় একই উপায়ে। সেই সময় ফরমান বার করা হল, কোনও সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলের খবর করতে পারবে না, বিরোধীরা যে জেলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাও জানানো যাবে না দেশবাসীকে। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমই এই রাজাজ্ঞা মেনে নিয়েছিল, হয়তো বাধ্য হয়েছিল। সেদিনের জনসংঘের নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, ‘ইন্দিরা সংবাদমাধ্যমকে হামাগুড়ি দিতে বলেছিলেন, কিন্তু এরা যে শুয়ে পড়ল।' অবশ্যই আজকের মতোই কিছু সংবাদমাধ্যম এর ব্যতিক্রম ছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রমাণ করে। সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, গুজরাতের সাহিত্য অ্যাকাডেমির প্রধান কবি পারুল কক্করের ‘শববাহিনী গঙ্গা' কবিতাটিকে ‘নৈরাজ্যের কবিতা' বলেছেন। বলেছেন, এগুলো কবিতা হতে পারে না। ইন্দিরাও বলতেন, এগুলো সংবাদই হতে পারে না। আজকের শাসক সামান্য একটা কবিতাকে নিজেদের অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক মনে করছেন, ইন্দিরা যেমন কিশোর কুমারের গানকেও তেমনই মনে করতেন। রাষ্ট্র যখন ঠিক করে দেয়, জনগণ কী পড়বে, কী খাবে, কী গাইবে, কী লিখবে— তখন তাকে যদি নৈরাজ্য বলা না যায়, তবে নৈরাজ্য কোনটা? শাসকরা কি বাকুনিন পড়েননি?

 
1977-এর নির্বাচনে কার্যত পর্যুদস্ত হয়ে ইন্দিরা গণতন্ত্রের চপেটাঘাত কত ভয়ঙ্কর তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। অক্লেশে বলতে পেরেছিলেন, ‘জরুরি অবস্থা আমাকে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে'। আজকের শাসকের রাজনৈতিক মধুমাস এখনও অতিক্রান্ত হয়নি। তাই ক্ষমতার গজদন্তমিনারে বসে তাঁরা ভাবছেন, তাঁরা ভুল হতে পারেন না, বাকি সবাই ভুল, আরবান নকশাল কিংবা দেশদ্রোহী। শাসক শিবিরের বিদ্রুপ শুনি মাঝেমধ্যে, একটা মোদীকে আটকাতে সব বিরোধী নাকি একজোট হচ্ছে। ইন্দিরা শিবিরও বলত, একটা ইন্দিরাকে রুখতে জয়প্রকাশ নারায়ণ বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। সেদিনের জরুরি অবস্থার অভিঘাত কী হয়েছিল? অনেকেই বলবেন, তেমন কিছুই নয়। ছত্রভঙ্গ বিরোধীদের সরিয়ে 1980-তে ইন্দিরা মসনদে ফিরেছিলেন৷ কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত ছিল অনেক সুদূরপ্রসারী। সেই আন্দোলনের হাত ধরে বিভিন্ন রাজ্যে বামপন্থীরা শক্তিবৃদ্ধি করেছিলেন, বাংলায় দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনের অবসান ঘটেছিল। আর সেদিনের জনসংঘ (অধুনা বিজেপি) যে রাজনৈতিক ভিত্তি জেপি আন্দোলন, জনতা দলের ত্রহ্যস্পর্শে পেয়েছিল, তা পুঁজি করেই তারা ক্রমে রামজন্মভূমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লোকসভায় 2 সদস্য বিশিষ্ট দল থেকে আজকে 303 সদস্যবিশিষ্ট একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। ইন্দিরার সাধের কংগ্রেস (আই)-কে এখন কষ্টেসৃষ্টে লোকসভার 50টি আসন জয় করতে হয়। বিজেপির যাবতীয় অগণতান্ত্রিক কাজের সাফাই হিসাবে সেই দলের নেতারা 75-এর জরুরি অবস্থাকে তুলে ধরেন। কার্ল মার্ক্সের একটা উক্তিকে আমরা খণ্ডাকারে তুলে ধরি। আমরা অনেকেই জানি, তিনি বলেছিলেন, ‘History repeats itself'. তারপর তিনি বলেছিলেন, ‘first as tragedy, second as farce'. গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়াসী অগণতান্ত্রিক আচরণ করা শাসক যেন এই উক্তিটাকে খণ্ডাকারে গ্রহণ না করে। 


New
মাদক ব্যবসা ও বিভাজনের রাজনীতির আবর্তে আজকের মণিপুর
ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় মদত? বিস্ফোরক রিপোর্ট অসম রাইফেলসের
বিরোধী জোট আছে, রাজনীতি কই?


Other Writings by -বিতান ঘোষ | 24-06-2021

// Event for pushed the video