×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • রানারের খবর রানারকেই রাখতে হবে

    অয়ন্তিকা দত্ত মজুমদার | 20-07-2020

    সংবাদকর্মীদের কাজে কখন দিন শুরু হয়, আর কীভাবে যে রাত পেরিয়ে ভোর হয়, সে খেয়াল কারও থাকত না। রাতদিন কাজ, শনি-রবিবারের বালাই নেই, উৎসব-অনুষ্ঠানও কাজের মাঝে অন্যভাবে সেলিব্রেট করেই দিন কেটে যেত। কিন্তু গত চার মাসে, করোনার থাবায় পাল্টে গিয়েছে এই পুরো চিত্রটা। ঘরে বন্দি হয়েছে গোটা বিশ্ব। অফিসের চার দেওয়াল এখন বাড়ির ড্রয়িং রুমে স্থায়ী আস্তানা গড়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ-সিনেমা হলে ঝুলছে তালা। এর মাঝেও প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে সংবাদকর্মীরা। সাধারণ জমজমাট রাস্তার শুনশান ছবি হোক বা কোভিড হাসপাতালে গিয়ে খবর করা বা কোনও সাধারণ মানুষের বাইট নেওয়া, করতে হচ্ছে সবকিছুই। কখনও মাস্ক-গ্লাভস পরে, তো কখনও গোটা পিপিই কিট পরে। অনেককে আবার একেবারে ঘরবন্দি হয়েই কাজ করতে হচ্ছে। এখনও দেশে এবং রাজ্যে ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। প্রতিনিয়ত প্রাণ সংশয় তো আছেই, সেই সঙ্গে সংবাদকর্মীদের এখন ভুগতে হচ্ছে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায়।

     

    দুনিয়ার খবর এনে দেয় যারা, তারা নিজেরা কেমন আছে?

     

    লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চর্চা বেড়েছে চারিদিকে। নিউ-নর্ম্যাল জীবনে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সকলকেই। গত 14 জুন বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর অনেকেই "ডিপ্রেশন' নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। এই রকমই একটি আলোচনা হল গত 19 জুলাই, ‘Mental Health Issues faced by Media Personnel during lockdown’, নামে এক ওয়েবিনারে। সাইকোলজিকাল কাউন্সিলর জ্যোতি সাপ্রু প্রায় ঘণ্টাখানেকের ওয়েবিনারে মিডিয়ায় কর্মরত মানুষদের সমস্যা এবং মানসিক অবস্থা নিয়ে খোলাখুলি নানা কথা বললেন। কারও মধ্যে যদি এই সকল সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে তাঁরা কীভাবে সেই সমস্যার মোকাবিলা করবেন সেই ব্যাপারেও ধারণা দিলেন।

     

    এই মুহূর্তে মিডিয়া কর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর নিজের চাকরি বাঁচানো। যে কোনও মুহূর্তে আসতে পারে একটা ফোন এবং নিমেষে চলে যেতে পারে চাকরি, যে কারও। ফলে যেভাবেই হোক সকলেই চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, কোথাও আবার স্যালারি কাটও হচ্ছে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা কমেছে, কাগজের সার্কুলেশন কমেছে, রয়েছে সেই চিন্তাও। এছাড়া অনেককে বাড়ি থেকে বসেও কাজ করতে হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সকলের কাছেই যা একেবারে অচেনা একটি বিষয়। তাছাড়া যাঁরা ফিল্ডে নেমে কাজ করছেন এই মহামারী তাঁদের শরীরে প্রবেশ করার ভয়ও থাকছে, অনেকেরই বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা বা ছোট বাচ্চা আছে। এছাড়া সাম্প্রতিককালের আরও এক বড় সমস্যা, ঠিকঠাক ইন্টারনেট পরিষেবা। বাড়ি বসে কাজ করলে বাড়ির ইন্টারনেটই ভরসা, সেই ইন্টারনেট পরিষেবায় সমস্যা হলে ডেডলাইন মিস হয়ে যাওয়ার চাপ থাকছে। এছাড়া সোশাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত যে ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে এবং তার জন্য সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়া জুড়ে যেভাবে সংবাদকর্মীদের দুষছেন, সেটাও অত্যন্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ভুয়ো খবরগুলির সঙ্গে সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীদের কোনও যোগাযোগ থাকে নাসবশেষে আসে এই মুহূর্তে মিডিয়ায় কর্মরত প্রত্যেককে যে সমস্যা বা আতঙ্কের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তার কথা, ‘Freedom of Press’মিডিয়ার বাক্-স্বাধীনতায় যেভাবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার হস্তক্ষেপ করছে তাতে সকলেরই মনে এবং মাথায় চাপ পড়তে বাধ্য, সকলের মধ্যেই এক অজানা ভয় বাসা বেঁধেছে।

     

    আরও পড়ুন: আত্মহত্যার প্রবণতা: পাশে থাকার সদিচ্ছার সঙ্গে চাই চিকিৎসাও

     

    এমন অবস্থায় কোনও মিডিয়াকর্মী কীভাবে বুঝবেন যে তিনি আদৌ অ্যাংজাইটি বা ডিপ্রেশনের শিকার কিনা এবং যদি তাই হয় তাহলে তাঁর সেই অবস্থায় ঠিক কী করা উচিত, জানালেন সাইকোলজিস্ট জ্যোতি সাপ্রু। তিনি বেশ কিছু বড় মিডিয়া হাউসের নাম করে বলেন, এই মহামারীতে যে কেবল গ্রাহক কমেছে তাই নয়, সঙ্গে কমেছে বিজ্ঞাপনের সংখ্যাও, ফলে কাগজে কমেছে পৃষ্ঠা সংখ্যা। এবং সমস্ত বড় বড় মিডিয়া হাউসও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রাতারাতি বহু কর্মী ছাঁটাই করেছে। চাকরি চলে যাওয়া এবং আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা প্রচণ্ড বড় ভয় সৃষ্টি করে মনে।

     

    এই অবস্থায় করোনা ভাইরাস সম্বন্ধে সকলকে অবহিত করার পাশাপাশি নিজেদেরকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবহিত করাটাও অত্যন্ত জরুরি। কেবল তাই নয়, এই মহামারীর ফলে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের মধ্যে অ্যাংজাইটি-ডিপ্রেশন-প্যানিক ডিসঅর্ডারের সঙ্গে দানা বাঁধছে শারীরিক অসুস্থতা বা রোগ সংক্রমণের ভয়ও। আইসোলেশনে থাকলে রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু পরিবার-পরিজনের থেকে দূরে থাকতে থাকতে ঘিরে ধরে একাকীত্ব। এই একাকীত্ব সঙ্গে করে নিয়ে আসে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা। তাই আমাদের প্রথমেই দরকার সকলকে এই মানসিক ব্যধি সম্বন্ধে সতর্ক করা।

     

    জ্যোতি সাপ্রু ডিপ্রেশন এবং অ্যাংজাইটির মানে বোঝাতে গিয়ে দু’টি উদাহরণ দেন। প্রথম, একধরনের সাংবাদিক যাঁদের চাকরি চলে গেছে। হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া এবং উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যক্তি ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারে। আবার অপর ধরনের সাংবাদিক আছেন, যাঁদের চাকরি আছে, কিন্তু এই বাজারে দ্বিগুণ কাজ করতে হচ্ছে অথচ বেতন সেরকম মিলছে না, তবু চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যেতেই হচ্ছে এবং এরই সঙ্গে ফিল্ডে নেমে কাজ করলে রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয় মনে বাসা বাঁধছে। ফলে, তাঁদের মধ্যে দানা বাঁধছে অ্যাংজাইটি। তবে সমীক্ষায় দেখা গেছে 45 শতাংশ মানসিক রোগাক্রান্ত মানুষের মধ্যে দুই বা তার অধিক সংখ্যক সমস্যার বীজ লুকিয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তির একইসঙ্গে অ্যাংজাইটি এবং ডিপ্রেশন দুইই হতে পারে।

     

    কীভাবে বোঝা যাবে যে কেউ ডিপ্রেশনে বা অ্যাংজাইটিতে ভুগছে কিনা? দু’টোর কিছু সাধারণ উপসর্গ আছে, যেমন, ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে হয়ে যাওয়া, মনোযোগে সমস্যা ইত্যাদি। এবার এদের মধ্যে তফাৎ? ডিপ্রেশন মানে যখন কেউ খুব দুঃখে আছে, হতাশ হয়ে পড়েছে এমন। এটা এমনিতে স্বাভাবিকই। কিন্তু যদি এমন অবস্থা টানা বহুদিন বা মাস বা বছর ধরে চলতে থাকে তাহলে তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ক্ষমতাহ্রাস পাওয়া, ক্লান্তি, অবসাদের শিকার হওয়া, কাজে কুঁড়েমি ধরা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া, কিংবা শরীরে বিভিন্ন ধরনের ব্যাথা বেদনা ইত্যাদি হওয়া এবং সবচেয়ে সাংঘাতিক আত্মহত্যার প্রবণতাও ডিপ্রেশনের লক্ষণ।

     

    অ্যাংজাইটি বিভিন্ন সময়ে হতে পারে। কোনও বড় বা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আগে বা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অ্যাংজাইটি হওয়া খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু এটাও দীর্ঘদিন চললে তা দৈনিক জীবনে ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে। উপসর্গ ক্লান্তি, মনোযোগ বা স্মৃতিশক্তি হ্রাস, পেশিতে যন্ত্রণা, বুক ধড়ফড় করা (racing heart), দাঁত কিড়মিড় করা (grinding teeth), ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি।

     

    এবার কীভাবে বুঝবেন আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন নাকি অ্যাংজাইটিতে? সেল্ফ হেল্প টেস্ট এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল উপায়। আপনি জানেন আপনি নিজে কেমন, আপনার চরিত্র কেমন। নিজের মধ্যে যদি কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন, সেটার মাধ্যমে আন্দাজ করতে পারবেন আপনার কী হয়েছে। তবে বারবার সাইকোলজিস্ট জ্যোতি সাপ্রু যে কথাটা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, যদি একবারের জন্যও মনে হয় আপনার আচার-ব্যবহার বা চরিত্রে কোনও পরিবর্তন এসেছে বা আপনাকে হতাশা ঘিরে ধরেছে বা নিজেরই মনে হচ্ছে যে আপনি ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটির শিকার তাহলে অতি অবশ্যই মানসিক রোগবিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাঁরা আমার-আপনার মনের কথা শুনতেই অপেক্ষা করে আছেন। এই ধরনের উপসর্গ দেখা গেলে তা চেপে বসে থাকা কোনও কাজের কথা নয়। তাছাড়া আপনার স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকে চেপে রাখবেন না, কোনও বিষয়ে নিজেকে ব্যর্থ ভাবার কোনও কারণ নেই। আপনি গোটা দিনের একটা রুটিন তৈরি করে চলতে পারেন। যে কাজ নিজের আয়ত্তের মধ্যে আছে সেরকম কাজ করুন। এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। কোনও রকম অস্বাভাবিকতা নজরে এলে সাহায্য নিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের।

     


    অয়ন্তিকা দত্ত মজুমদার - এর অন্যান্য লেখা


    নিজের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য নিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের।

    এঁদের জীবনেও যদি একজন অ্যালবাস ডাম্বেলডোর বা একজন হ্যারি পটার বা একজন হ্যাগ্রিড থাকত!

    এই মানুষগুলোর খাদ্যের ব্যবস্থাও কিন্তু রাষ্ট্রকেই করতে হবে

    বিজেপি সরকার প্রথম থেকেই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি করতে উদ্যত। সেখানে জম্মু ও কাশ্মীর মুসলিম রাজ্য

    জীবন অতিবাহিত করার জন্য পড়াশোনা আবশ্যিক, কিন্তু সেটাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়

    পরিবেশ দূষণ, ভূমিক্ষয় ইত্যাদির ফলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ এখন জলভাত। কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর উপায় কী?

    রানারের খবর রানারকেই রাখতে হবে-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested