×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • প্রচার দুর্দান্ত, তবু প্রভাবে ঢের পিছিয়ে কলকাতার পুর-স্বাস্থ্য

    শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত | 13-12-2021

    নিজস্ব ছবি

    কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে তৃণমূল যতটা প্রচার করেছে সেই পরিমাণ কাজ কি হয়েছে? কলকাতা পুরসভার 144টি ওয়ার্ডে পা রাখলে যে ছবি নজরে আসে তাতে এই সংশয় আরও দৃঢ় হয়। নির্বাচনী প্রচারে কলকাতা পুরসভার বর্তমান শাসক দল গলা ফাটিয়ে নিজেদের সাফল্য প্রচার করলেও প্রদীপের নীচের সেই অন্ধকার এখনও রয়ে গিয়েছে।

     

     

    নির্বাচনী প্রচারে স্লোগান ও পোস্টারে তৃণমূল বলছে, "রাস্তা আলো মিষ্টি জল, মোড়ে মোড়ে বসল কল।’ তবে এর কোথাও স্বাস্থ্যের কথা লেখা নেই। প্রচারে কোনও প্রার্থী বলছেন না স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি কথাও। বলছেন না, আমাকে ভোট দিন আমি আপনাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেব। উল্টে বলছেন, "কাছের মানুষ, কাজের মানুষকে ভোট দিন।’ কাছের মানুষ, কাজের মানুষটি করবেন কী তার কার্যত কোনও দিশা নেই।

     

     

    কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বিরোধীদেরও। তবে কলকাতা পুরসভার বিদায়ী ডেপুটি মেয়র ও মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষ দাবি করেছেন, ""কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথেষ্ট ভাল। তবে আরও ভাল করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” তিনি মানতে নারাজ যে কলকাতা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ যা হয়েছে তার চাইতে কথা বেশি হয়েছে। অতীনবাবু জানিয়েছেন, ""এখনও কলকাতা পুরসভার 144টি ওয়ার্ডের সবক'টি ওয়ার্ডে দুটো করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। তাই আগামী দিনে 59টি ওয়ার্ডে আরও একটি করে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র করা হবে। এ ছাড়াও 16টি বরোতে অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট সিস্টেম (Advance Treatment System ) চালু করা হবে। এই অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট সেন্টারে ইকো কার্ডিওগ্রাফি, ইসিজি ইত্যাদি করার ব্যবস্থা হবে।''

     

     

    অতীন ঘোষ আগামী দিনে কী করবেন সেটা পরের কথা। তবে এই মুহূর্তে কলকাতা পুরসভার 144টি ওয়ার্ডের সবক'টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ন্যূনতম এক জন করে চিকিৎসক নেই। থাকার কথা দু'জন করে। অনেক ক্ষেত্রে অস্থায়ী চিকিৎসক কাজ চালাচ্ছেন। ন্যাশনাল আরবান হেলথ মিশন (National Urban Health Mission) প্রকল্পের কাজ 100 দিনের কর্মীদের দিয়ে করানো হচ্ছে বহু ক্ষেত্রে। স্থায়ী কর্মী সর্বত্র নেই। কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা মাসে 40 হাজার টাকা বেতন পান। অন্য কোনও সুবিধা তাঁরা পান না। তাই তাঁরা পুরসভার স্বাস্থ্য পরিষেবায় কাজ করতে চান না। এমন অভিযোগ বিভিন্ন পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকদের মুখে শোনা গিয়েছে। এ ছাড়াও পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকদের রাজনৈতিক নেতাদের চোখরাঙানি সহ্য করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকরা কাজ করতে চান না। সমস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ন্যূনতম এক জন করে ল্যাব টেকনিশিয়ান, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফার্মাসিস্ট, নার্স নেই। চিকিৎসা কর্মীর এই ঘাটতির কথা মেনে নিয়েছেন পুরসভার শাসক দলের কাউন্সিলরদের একটা বড় অংশ।

     

     

    কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল কাজ হচ্ছে জনস্বাস্থ্যে নজরদারি করা। পোলিও টিকা, রুটিন ভ্যাকসিন দেওয়া, রক্ত পরীক্ষা করা, যক্ষ্মর চিকিৎসা করা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসা করা ও এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা। বাস্তবে সেই কাজটা পুর এলাকার সর্বত্র সমান গুরুত্ব দিয়ে হয়নি। এই অবস্থায় করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ায় সেই দিকে নজর দিতে গিয়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দিকগুলোতে গুরুত্ব কমিয়েছে পুরসভা। এর ফলে জনস্বাস্থ্য অনেকাংশে বিঘ্নিত হয়েছে। গোপনে বেড়ে চলেছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু।

     

     

    কলকাতা পুরসভার 99 নম্বর ওয়ার্ডের আরএসপি-র বিদায়ী কাউন্সিলর দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়র অভিযোগ,  ""অতীন ঘোষ ভেবেছিলেন পুরসভার স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অনেক কিছু করবেন, তবে সবটাই তাঁর পরিকল্পনার স্তরে রয়ে গিয়েছে। বাস্তবায়ন সেই অর্থে হয়নি। তাই এখনও পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই বলা যায়, কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি সেই অর্থে পরিষেবা দেওয়ার উপযোগী অবস্থায় নেই।

     

     

    তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রমও আছে। তাই সবটা যে খারাপ সেটা বলা যাবে না। সার্বিক ভাবে খারাপ হলেও পুরস্বাস্থ্য পরিষেবায় কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও সাফল্যের নজিরও নজরে পড়ে। কলকাতা পুরসভার 112, 98, 115, 101, 82, 11 নম্বর ওয়ার্ডে পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। 112 নম্বর ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। এখানকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট আছেন। নিয়মিত শিশুদের ভ্যাকসিনেশন হয়। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রচার চালানো হয়। এই ওয়ার্ডের তৃণমূলের বিদায়ী কাউন্সিলর অনিতা কর মজুমদার জানিয়েছেন, ""আমি 112 নম্বর ওয়ার্ডে বিগত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক কাজ করতে পেরেছি। তবে আরও কাজ করার আছে বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্র যথেষ্ট নয়। কোনও ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী জায়গায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলে সবার পক্ষে সেখানে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু ওয়ার্ডের সীমানায় যদি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয় তা হলে সেখানে সবাই সহজে পৌঁছতে পারেন না। তবে আমি এ বার পাশের 113 ওয়ার্ডের প্রার্থী। 112 নম্বর ওয়ার্ডে আমি প্রার্থী হলে আমার আরও যে সমস্ত কাজ করা বাকি আছে সেটা করতে পারতাম।

     

    আরও পড়ুন: তৃণমূলের সাফল্যই কি বামফ্রন্টের অনুপ্রেরণা?

     

    112 নম্বর ওয়ার্ডে যক্ষ্মার চিকিৎসা হয় না।  113, 98 নম্বর ওয়ার্ডে যক্ষার চিকিৎসা হয়। 111 নম্বর ওয়ার্ডের বোড়াল সরকারি যক্ষ্মা হাসপাতালে এই ওয়ার্ডের যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা হয়। 98 নম্বর ওয়ার্ডের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা পরিষেবা নিতে রোজ বহু মানুষ আসেন। এখানে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসাও হয়। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক অরিজিৎ সেন জানালেন, ""আমাদের এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ব্লাড সুগার ইত্যাদির রক্তপরীক্ষা হয়। এ ছাড়াও রুটিন ভ্যাকসিনেশন হয় শিশুদের। যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা হয়। শুধু 98 নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারাই নয়। পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের থেকেও মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন চিকিৎসা পরিষেবা নিতে।

     

     

    তবে অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে অতীন ঘোষ জানান, ""পুরসভার কাজ হাসপাতাল চালানো নয়। অনেক জায়গায় মেটারনিটি হোম রয়েছে বলে পুরসভা সেগুলির দেখভাল করছে। তবে পূর্ব কলকাতার চম্পামণি মেটারনিটি হোমকে আর্বান প্রাইমারি হেলথ সেন্টারের আওতায় আনা হবে।

     

     

    তবে কলকাতা পুরসভার প্রায় সবকটি ওয়ার্ডেই 90 শতাংশের বেশি করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। তবে বিরোধীরা বলছে, এটা রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সহযোগিতা করেছে বলেই সম্ভব হয়েছে। না হলে এই কাজও হত না। তাই বলা যায়, কলকাতার পুরস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপুল ঘাটতি, তুলনায় শাসক দলের প্রচার অনেক।


    শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত - এর অন্যান্য লেখা


    কলকাতায় সার্কাসের তাঁবু উধাও। একসময় শহরে শীতের বার্তা নিয়ে আসত এই সার্কাসের তাঁবু।

    জ্বালানির দামবৃদ্ধির সঙ্গে এবারের অতিবৃষ্টি যুক্ত হওয়ায় শাক সবজি অগ্নিমূল্য, এখনই দাম কমার আশা নেই।

    নেতাজির 125তম জন্মদিন নিয়ে কমিটি, প্রধানমন্ত্রী চেয়ারম্যান, নেই কোনও বৈঠক।

    সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে চতুর্থ শ্রেনির কর্মীর অভাবে সময়মতো সাফসুতরো করে স্কুল খোলা নিয়ে সংশয়।

    ‘প্লাসমোডিয়াম ওভাল’, করোনার পাশাপাশি নতুন সমস্যা!

    Retro Fitting পদ্ধতিতে ডিজেল চালিত বাসকে সিএনজিতে রূপান্তরিত করায় মত নেই বিশেষজ্ঞদের।

    প্রচার দুর্দান্ত, তবু প্রভাবে ঢের পিছিয়ে কলকাতার পুর-স্বাস্থ্য -4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested