×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • ‘খারাপ অভ্যেস’ আর মহিলা বিজ্ঞানীর জিজ্ঞাসার বদভ্যাস

    সুস্মিতা ঘোষ | 12-01-2022

    নিজস্ব ছবি

    করোনাকালে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ঘরে ঘরে সংখ্যাতত্ত্ববিদের ছড়াছড়ি। কোন মাস্ক কতটা সুরক্ষা দেয়, কোন ভ্যাকসিন ভাল, এ বার কোন স্ট্রেইন আসতে চলেছে, এই সব বিষয়ে দেখছি সবাই নানা রকম আউড়ে বিশেষজ্ঞের মতামত দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে একটা ভীষণ বিপজ্জনক দিক আছে। অনেকের মাথায় এখনও গেঁথে বসে আছে, ‘‘ওই তো মৃত্যুহার মাত্র 2%, করোনা তেমন কিছু রোগই না।’’ কারও কাছে বা ভ্যাকসিন, মাস্ক এ সব কর্পোরেট চক্রান্ত মাত্র।

     

    দ্বিতীয় ওয়েভ-এর মৃত্যুমিছিল দেখার পরও এই ধরনের প্রচার অবশ্যই ভীষণ ক্ষতিকারক। কিন্তু এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা তৈরির পিছনে নানা মানসিকতা এবং অন্যান্য ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত নানা তথ্য/অভিজ্ঞতা কাজ করে। গত দু’দশক ধরে ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে কাজ করে কর্মজীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে পাওয়া কিছু অভিজ্ঞতার নিরিখে সংখ্যাতত্ত্বের সুবিধাবাদী ব্যবহার কী ভাবে এই সব ধারণার জন্ম দিতে পারে, তার আলোচনাই আমি এই প্রতিবেদনটিতে করব।

     

    এডস এবং HIV

     

    প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে, ক্লাসে আমাদের এক মাস্টারমশাই বলেছিলেন ‘‘এ সব রোগ খারাপ অভ্যেস থেকে হয়, কাজেই এ নিয়ে আলোচনা করার দরকার নেই।’’ অচিরেই যদিও রক্তদানের মারফৎ এডস ছড়ানোর বিপদ জানা গেল, তবুও ‘খারাপ অভ্যাস’-এর ট্যাবু রয়েই গেল। বিশ বছর আগে যখন পুণেতে বাস শুরু করি, তখন আমার ঘরের মানুষটির সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সময়ে এই প্রশ্নটি করতে দেখেছিলাম। এই সময়ে এই ট্যাবু নিয়ে যে কত গল্প লেখা হয়েছে, কত সিনেমা বানানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ঋতুপর্ণর ‘অসুখ’, ‘My brother Nikhil’, হলিউডে Philadelphia তো মাত্র কয়েকটা উদাহরণ!

     

    প্রায় এই সময় থেকেই আমি এডস রোগ নির্ণয় নিয়ে কিছু কাজ শুরু করি। স্যাম্পলের খোঁজে নানা চিকিৎসকের কাছে নানা রকম ‘খারাপ অভ্যাস’-এর গল্প শুনলাম। আবার জানলাম, কাউকে দু-তিন রকম আলাদা আলাদা পরীক্ষা ছাড়া HIV পজিটিভ ঘোষণা করার নিয়ম নেই, করলে তা শাস্তিযোগ্য, কারণ ভুল ভাবে HIV পজিটিভ চিহ্নিত করলে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি হতে পারে। এই সময়েই আমার ‘পাড়ার ডাক্তারবাবু’ জাতীয় বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার কাছে HIV পজিটিভ কেস আসে কি না। উত্তর এসেছিল, ‘‘Oh, yeah!!!!!’’ “কত ঘনঘন?” প্রশ্নের জবাব ছিল, ‘‘সপ্তাহে দু’-তিনটে!’’ শুনে রীতিমতো আতঙ্কিত লেগেছিল। মধ্যবিত্ত পাড়া, সপ্তাহে দু’-তিনটে করে কেস... তা হলে তো যে কোনও সময়েই এডস রোগীর সঙ্গে মোকাবিলা হবে! তখন কী করব?

     

    বাস্তবটা হল ঠিক উল্টো। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে আড়াই মাসে মাত্র 16টা স্যাম্পল পেয়েছিলাম— একটাও আমাদের পাড়া থেকে নয়। ওই ডাক্তারবাবুর সহযোগী প্যাথলজিস্ট-এর একটি ল্যাব ছিল লালবাতি এলাকায়, সমস্ত স্যাম্পল সেখানের। পাড়াতে বিশ বছরেও কোনও HIV পজিটিভ-এর খোঁজ পাইনি।

     

    আরও পড়ুন:গঙ্গাসাগর মেলা: ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্মুখ সমর

     

    HIV-র জুজু সেই যুগে আরও অনেক জায়গায়। কোনও ল্যাবে HIV নিয়ে কাজ করতে গেলেই সেখানে বায়ো সেফটি লেভেল 2-এর ওপরে রাখতে হত, হাওয়া নিয়ন্ত্রণে খুব জোর দেওয়া হত। এখন ভেবে খুব মজা লাগছে যে HIV তো কোনও দিনই বায়ুবাহিত ছিল না, কিন্তু তার জন্য ছিল অনর্থক ঘটা। যে ঘটা অন্য মারাত্মক রোগের গুরুত্বকেও কমিয়ে ফেলত। এক বার একটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে গেছি, সেখানে এক কর্মী এক রোগিণীর রক্ত খালি হাতে নিয়ে স্লাইডে টেনে আমাদেরই সামনে শুকোতে দিল এবং হাত না ধুয়েই চা করে খাওয়াল। বললাম, গ্লাভস তো পর, ওর রক্ত থেকে তোমার কিছু হলে? সে বলল, আরে এত চেনা মানুষ, কিছু হবে না। আমি বললাম, তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি চেনা মানুষ বলে HIV না থাকতে পারে, কিন্তু হেপাটাইটিস? সেটা তো রক্ত দিয়ে ঢুকে এক সপ্তাহে শেষ করে দিতে পারে!

     

     

    গত বিশ বছরে ধীরে ধীরে নিয়ম চালু হয়েছে রক্তদানের সময়েই HIV ও হেপাটাইটিস-এর পরীক্ষা করে নেওয়ার। HIV নির্ণয় এখন বেশ সহজসাধ্য এবং নির্ভরযোগ্য। হেপাটাইটিস বি-র টিকা সহজলভ্য। নিষিদ্ধ পল্লিগুলিতে এডস সচেতনতা বেড়েছে বহু গুণ। ওষুধ সহজলভ্য হয়েছে। HIV-র নিজস্ব রহস্যের কারণে টিকা বানানো যায়নি। রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুহার কমলেও রোগটা আছে।

     

    কিন্তু একটা বড় তফাৎ আছে। মধ্যবিত্তের ভয়ের রোগের মধ্যে এডস আর পড়ে না। আজকাল আর HIV-র মিউটেশন কত বেশি আর এত বছরেও ভ্যাকসিন কেন বেরলো না নিয়ে প্রায় কারও মাথাব্যথা নেই। অমুকের অনেক দিন ধরে মৃদু জ্বর হচ্ছে শুনলে আর কেউ গলা নামিয়ে নিষিদ্ধপল্লির প্রসঙ্গ তোলে না।

     

    আর একটা কথা না বললেই নয়। বছর দশেক আগে একটি সার্ভেতে বলা হয়েছিল, চিকিৎসকদের মারাত্মক রোগের পরিসংখ্যান বেশ বাড়িয়ে বলা একটি কমন রোগ। এই কারণে এডস-এর যা পরিসংখ্যান রেকর্ডে আছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেকটাই কম। অর্থাৎ পাড়ার ডাক্তারবাবুর ‘সপ্তাহে দু’-তিনটে’র গপ্পের মতো।

     

    জরায়ুমুখের ক্যান্সার

     

    আপনাদের অনেকেই জরায়ুমুখের ক্যানসারের পরিসংখ্যান শুনেছেন, ‘ভারতে প্রতি ঘণ্টায় সাত জন মারা যায়’ বা ‘সারা বিশ্বে প্রতি দু মিনিটে এক জন মারা যায়।’

    যে কোনও মৃত্যুই দুঃখের এবং যদি সেই মৃত্যুকে প্রতিরোধ করার উপায় থেকেও কাজে লাগানো না যায়, তবে তা আরও বেশি দুঃখের। কিন্তু আর একটি পরিসংখ্যান স্বভাবতই দেওয়ার প্রয়োজন: সারা পৃথিবীতে গড়ে এক মিনিটে 110 জন মারা যান, 278 জন জন্মান। জরায়ুমুখের ক্যান্সারে মৃত্যু 0.5% এরও কম।

     

    আমি এখানে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অবতারণা করতে চাই। বিশ বছর আগে মাতৃভূমিতে ফিরে আসার আগে আমি দশ বছর আমেরিকাতে কাটিয়েছি। হাসপাতালে উচ্চশিক্ষা করার সুবাদে আমার হেল্থ ইন্সুরেন্স ছিল ভাল। সারা বছর বিনা পয়সায় নানা রুটিন টেস্ট করাতাম, মাথাও ঘামাতাম না। এর মধ্যে একটি হল pap smear টেস্ট, বছরে এক বার করানোর কথা। এতে জরায়ুমুখের স্বাস্থ্য ঠিক আছে কি না জানা যায়।

     

     

    আরও পড়ুন:ওমিক্রন: আতঙ্কের কিছু নেই

     

    দেশে ফিরে এসে অভ্যাসবশত ওই টেস্ট করাতে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার নজরে আসে। আবার ওই একই সময়ে আমার শরীরে ঋতুচক্রের কিছু অসাম্য দেখা দেয়। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হই- তিনি আমার দিদি হন, অভিজ্ঞা অধ্যাপক। তিনি বললেন কিছু ইনফেকশন হয়েছে, আর মেনোপজ এগিয়ে আসছে। আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্ট্রেস এবং এ দেশের জীবাণুকে নতুন করে সামাল দিতে গিয়ে এই সব হয়েছে। এর জন্য আমি যেন আমার বাসস্থান পুণেতে ফিরে গিয়ে যে কোনও এক জন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে গিয়ে জরায়ুমুখের উপরের ইনফেক্টেড স্তরটাকে চাঁচিয়ে নিই। সদ্য বিলেতফেরত এক ডাক্তার জুটলো। তিনি বললেন চাঁচার পর যে টিস্যু বেরোবে, তাতে নিয়ম অনুযায়ী বায়োপসি করা হবে, এবং সেটা আলাদা আলাদা দু’জন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করানো হবে। কিন্তু কার্যকালে দেখা গেল, এক জন বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্টই দেখেছেন, লিখেছেন CIN1 এবং কোনও ম্যালিগন্যান্ট কোষ নেই।

     

    এই রিপোর্ট দেখে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞটি খুব চেঁচামেচি শুরু করে বললেন, আমার জরায়ুমুখের ক্যান্সার হওয়া শুরু হয়ে গেছে এবং পরের সপ্তাহের মধ্যেই যদি আমার জরায়ু এবং ডিম্বাশয় বাদ না দেওয়া হয়, তবে আমি পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যেতে পারি। আমি যত বলছি, রিপোর্টে যা লেখা আছে, তার আমি রেফারেন্স পড়ে দেখেছি, আমি এক জন বিজ্ঞানী, 15 বছর বাদে 5%-এর ক্যান্সার হতে পারে। সে আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল 10-15%। জিজ্ঞেস করল, আমি সিগারেট খাই কি না, কারণ ধূমপায়ীদের এই ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি। আমার ব্যথাহীন পিঠে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল, এইখানে তোমার নিশ্চয়ই ব্যথা আছে। আমি কিছুতেই তার কথায় ভিজছি না দেখে হঠাৎ মুখ দিয়ে তার আসল কথা বেরিয়ে গেল, ‘‘আমাদের কাছে প্যাকেজ (বড় সার্জারির) কেস তো বেশি আসে না!’’

     

    এর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার আগে একটা বাঁচোয়া হল, বায়োপসির বাকি টিস্যুটা পাওয়া গেল। সেটা নিয়ে গেলাম পুণের তখনকার সব চেয়ে বড় প্যাথলজিস্ট অজিত গোলউইলকার-এর (এখন প্রয়াত) কাছে। তিনি বললেন, যখন কোনও ইনফেকশন সারে, তখন তাড়াহুড়োতে জরায়ু মুখের যে অভ্যন্তরীণ ত্বক, তা অনেক সময়ে এবড়োখেবড়ো ভাবে নতুন স্তর তৈরি করে। সেটা দেখতে একটু অস্বাভাবিক লাগতে পারে অপটু চোখে, কিন্তু আসলে অস্বাভাবিক নয়। উনি আরও বলেছিলেন যে, জরায়ুমুখের ক্যান্সার খুব বিরল নয় বটে, কিন্তু খুব প্রচুরও নয়।

     

    আমি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ বার খুঁজে খুঁজে পেলাম অতি প্রাজ্ঞ ড: ঘোষকে, ঘটনাচক্রে যিনি প্রথম জনের শিক্ষকও বটে। তিনি বললেন, ‘‘ঠিক আছে, এ রকম যখন একটা সন্দেহ হয়েছে, প্রথমে তিন মাস বাদে চেক আপ করাও, তারপর ছ’মাস, তারপর এক বছর।’’ উনি প্রশ্ন করেছিলেন, হঠাৎ কী অসুবিধের জন্যে pap smear করিয়াছিলাম। আমি আমেরিকার অভ্যেস বলাতে দেখলাম ওঁর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। এই রকম সময়েই আমি British Medical Journal-এ দেখলাম, যে pap smear ঠিকমতো ব্যাখ্যা দিতে না পারার জন্য প্রচুর রজ্জুতে সর্পভ্রম-এর ঘটনা ঘটে।

     

    গত 15 বছরে একটা তথ্য উঠে এসেছে, জরায়ুমুখের ক্যান্সার কিন্তু যে কোনও ইনফেকশন থেকে হয় না, একমাত্র human papillomavirus (HPV) থেকে হয়। কিন্তু HPV আবার নানা রকমের, এদের মধ্যে মাত্র দু’রকম যৌন সংসর্গ বাহিত ভাইরাসই জরায়ুমুখের ক্যান্সার ঘটায়। কিন্তু এই দুই রকম ভাইরাসের আক্রমণ হলেই ক্যান্সার হয় না সব সময়ে, বেশির ভাগ সময়েই সুস্থসবল শরীর এই ভাইরাসকে বিতাড়িত করতে পারে, যদিও ফিরে আসার ঘটনাও ঘটে।

     

    আরও পড়ুন:করোনায় বাড়তি নজর, গোপনে বাড়ছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, বলছেন চিকিৎসকরা

     

    HPV নির্ণয় দুঃসাধ্য নয়। HPV-র টিকাও বেরিয়েছে ১২ বছরের কম বালিকাদের দেওয়ার জন্য।

    আমি খুশি হতাম যদি HPV-র ক্ষেত্রেও এডসের মতো ‘অত আর কেউ মাথা ঘামায় না’ বলতে পারতাম। গত পনেরো বছরে HPV গবেষণায় বিশাল পরিমাণ টাকা ঢালা হয়েছে দেশে ও বিদেশে। রাষ্ট্রীয় গবেষণাগার এবং স্টার্টআপ-রা চেষ্টা করছে নতুন নির্ণয় পদ্ধতি বার করার। গবেষণা চলছে যারা এক বার HPV আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের প্রতি বছর মনিটর করে রোগটার গতিপ্রকৃতি বোঝার।

     

    অস্বস্তিকর কিছু তথ্যও আছে। উচ্চমধ্যবিত্ত বেশ কিছু বালিকার বাবা-মার কাছে অনুযোগ শুনেছি যে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য তাদের শিশু চিকিৎসক রীতিমতো জোরাজুরি করছে। আর একটা অস্বস্তিকর তথ্য ঠিক আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মতো, ক্যান্সারের ভয় দেখিয়ে জরায়ু- ডিম্বাশয়ের অস্ত্রোপচারের প্যাকেজের আওতায় আনা।

     

    আমি নিজেও দুটি জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্ণয় শিবির পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করেছিলাম। 250 জনের মধ্যে এক জনও পাইনি যার ক্যান্সার নির্ণয় হল। পাওয়ার কথাও নয়, কারণ পরিসংখ্যান বলছে, এক লক্ষ জনে 4 থেকে 30 জন পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার, এই পরিসংখ্যান বা মৃত্যুর পরিসংখ্যান পরিবেশনই করা হয় অত্যন্ত নাটকীয়তার সঙ্গে, যাতে সংখ্যাগুলোকে ভয়ানক মনে হয়।

     

    আর একটা প্রশ্নও রয়ে যায়, এডস নিয়ন্ত্রণে সমাজ সংস্কারের ভূমিকা অপরিসীম। সে দিক থেকে দেখতে গেলে HPV এবং HIV সংক্রমণের রাস্তা একই। কিন্তু ‘নির্ণয় শিবিরে এসো’ বা ‘ভ্যাকসিন  নাও’ ছাড়া অন্য কোনও সামাজিক পদক্ষেপই চোখে পড়েনি। এই রোগটি যে যৌন সংসর্গেই ছড়ায়, সেটা বালিকাদের বাবা-মাদের অবগতির মধ্যে আনার কোনও প্রচেষ্টা নজরে পড়েনি। বরং এই রোগটির মৃত্যুহার ইত্যাদি সংখ্যাকে অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে, ভয়াবহ ভাবে দেখানোর প্রচেষ্টা নজরে পড়েছে। এডসের ক্ষেত্রে যেমন বলেছিলাম, সে রকম ‘সপ্তাহে দু’-তিনটে’ জাতীয় অতিরঞ্জন তো আখছার।

     

    আরও পড়ুন:ওমিক্রন, ভয়, বন্দিদশা…

     

    কোভিড

     

    উপরের আলোচ্য দু’টি রোগের থেকে কোভিডের একটা বড় তফাৎ আছে জনমানসে সংখ্যাতত্ত্বের প্রয়োগের দিক থেকে। অন্য দু’টি রোগে যত না বড় সংখ্যা, তার চেয়ে অনেক বড় জুজুকে দেখানো হয়েছে বা হচ্ছে। জরায়ুমুখের ক্যান্সারে মৃত্যুহার 0.5%, সেটা ঘোষণা করা হয় যথাসম্ভব ভীতিসঞ্চার করে। এডসে এখনও বছরে প্রায় সাত লাখ লোক মারা যান। মধ্যবিত্তের এডসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় না থাকলেও স্বীকার করে নেয় এডস মারণ রোগ। সেই একই ধরনের মধ্যবিত্ত, তাদের অনেকে ডাক্তারও, একটা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে উচ্চারণ করেন কোভিডে মৃত্যুহার, “ওই তো 2%!’’

     

    সারা পৃথিবীতে কোভিড ভ্যাকসিন নেওয়ার পর মারা গেছেন হয়তও কুল্লে হাজার জন, যেটা প্রায় অন্তত একটা করে ডোজ পাওয়া হাজার কোটি জনসংখ্যার হাজার ভাগের এক ভাগ। এই সংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীর যে কোনও ভ্যাকসিনকেই অত্যন্ত নিরাপদ বলা যায়। কিন্তু এখনও প্রচুর মানুষ ওই হাজার সংখ্যাটা ধরে বসে ভ্যাকসিন বিরোধী মতামত দিয়ে যাচ্ছেন। এই একই ধরনের লোকজনের অনেকেই পাশাপাশি মৃত্যুহারের 2%-এর 2-এ চোখ রেখেছেন। চরম সংখ্যা ভারতের সরকারি হিসেবের পাঁচ লাখ তাঁদের টলাতে পারে না! এই পাঁচ লাখের মধ্যে প্রচুর পরিচিত, প্রিয়জন আছে, তা জেনেও। জানি না, এ রহস্যের কারা সমাধান করতে পারবে, সংখ্যাতত্ত্ববিদ না মনস্তত্ত্ববিদ।

     

    (ড: সুস্মিতা ঘোষ ডায়াগনোরাইট-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং জৈব-রসায়নবিদ। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রাক্তন পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। সুস্মিতার ডায়াগনোরাইট সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত একটি স্টার্ট-আপ সংস্থা, যার লক্ষ্য সকলের জন্য সুলভে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক ডায়গনস্টিক্স।)

     


    সুস্মিতা ঘোষ - এর অন্যান্য লেখা


    সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আর রোগের পরিসংখ্যানের তাৎপর্য বোঝে না সাধারণ মানুষ, সুযোগ নেয় মেডিক্যাল

    ল্যাবরেটরিতে প্লাস্টিক খেকো ব্যাকটেরিয়ার মিউটেশন ঘটিয়ে সাফল্য আসলেও তার বাস্তবিক প্রয়োগ এখনও দূর

    ল্যাবরেটরি বা প্রকৃতিতে করোনা ভাইরাসের ডেল্টাক্রন রূপ বলে কিছু নেই, এটা নিতান্তই মিডিয়ার সৃষ্টি।

    আযুর্বেদকে সমান মর্যাদা দিলেও বৈজ্ঞানিক মাপকাঠিতে আজকের বাস্তবের আয়ুর্বেদ কখনই অ্যালোপ্যাথির তুলনীয়

    তিনটির মধ্যে একটি ভ্যাকসিন নিয়ে বহু প্রশ্ন

    দেশের সর্বত্র আইসক্রিম পাওয়া গেলে ভ্যাকসিন বণ্টনও অবশ্যই সম্ভব

    ‘খারাপ অভ্যেস’ আর মহিলা বিজ্ঞানীর জিজ্ঞাসার বদভ্যাস-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested