×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • শোভন চলে গেল, করোনা নয়, বিনা চিকিৎসায়

    অর্যমা দাস | 05-07-2020

    কোভিড-19 এর বজ্র আঁটুনিতে অন্য সব রোগের চিকিৎসার ব্যাপারটা একেবারেই ফস্কা হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে আসার মতো রোগ কি মানুষের হচ্ছেই না? হলে করোনার চৌকাঠ পেরিয়ে তারা কি স্বাস্থ্য পরিষেবার টেবিল অবধি পৌঁছতেই পারছে না? আমার বাড়ির পাশেই ঘটল এই ঘটনা।

     

    সকাল 11টায় পাড়ার এক দাদার ফোন, "জানিস? খুব খারাপ একটা খবর আছে। বটু দা'র ছেলেটা আজ সকালে মারা গেছে। কাল রাতে নাকি প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। মনে তো হচ্ছে কোভিডই। "আকাশ থেকে পড়লাম। আমার থেকে বয়সে একটু বড়, আমাদেরই বন্ধু, প্রাণোচ্ছ্বল ছেলে ছিল ভাই-দা (শোভন মজুমদার)। বারংবার অণিমা জেঠিমা'র মুখটা ভেসে উঠল চোখে। সবসময় হাসিখুশি থাকতেন মহিলা, ওনার প্রাণখোলা হাসি শুনতেই সকলে ওনার সঙ্গে মজা করতাম, আর হাসবে না জেঠিমা আগের মতো। সবাই সবাইকে ফোন করছেন পাড়ায়। কিন্তু প্রথমটায় যাওয়ার সাহস হচ্ছে না কারও। পরে ফোনে ফোনেই জানা গেল, কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। নিউমোনিয়া ছিল, চিকিৎসার অভাবে তা সেপ্টিমেনিয়া হয়ে যায়। ফুসফুস একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

     

    বাড়িতে গিয়ে সে দৃশ্য আর চোখে দেখা যায় না। অণিমা জেঠিমা (শোভন মজুমদারের মা) বারংবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই ভুলভাল কথা বলছেন। কখনও বলছেন, ‘আমার ছেলে লুচি খেতে চেয়েছে, আমি লুচি বানাব’, কখনও ছেলের ছবির পিছনে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির দেখিয়ে বলছেন, ‘আর কোনওদিনই পুজো দেব না আমি, ছেলের জন্য এত পুজো দিলাম, তাও কেড়ে নিলে তো ওকে তুমি আমার থেকে?’ এক কথায় সামলানো যাচ্ছে না ভাই দা'র মা-কে। জেঠু (শোভনের বাবা) একেবারেই স্তব্ধ। কোনও কথা নেই, কান্নাকাটিও নেই। সারা পাড়া তার সঙ্গে শোকস্তব্ধ। কেউ ভাবতেই পারছে না, এই তো কিছুদিন আগেও হেসেখেলে বেড়াত, সেই বাচ্চা ছেলেটা আর নেই।

     

    অবসরপ্রাপ্ত ব্যঙ্ক ম্যানেজার কিংশুক জোয়ারদার শোভনের প্রতিবেশী। প্রথম থেকে শেষ অবধি চিকিৎসার সময় ছিলেন শোভনের পাশেই। প্রত্যক্ষদর্শী কিংশুক জেঠুর কথায়:

     

    শোভন আমাদের ছেড়ে চলে গেল৷ ছেলেটা সামান্য লাজুক স্বভাবের, দেখা হলেই মুচকি হাসি শান্তশিষ্ট, কিন্তু চোখের কোণে বুদ্ধির ঝিলিক- ওর সমবয়সীরা ওকে ডাকত ভাইবলে৷ পোশাকি নাম শোভন হলেও, সে নামে পাড়ায় কেউ চিনত না, ও ছিল সবার ভাই৷ সমবয়সীদের কাছে ভাই, তাদের অভিভাবকদের কাছেও ভাই৷ সময়ের সাথে সাথে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে মা-বাবার একমাত্র সন্তান চাকরিসূত্রে বাইরে পা রাখল৷ ও ছিল পেশায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বর্ধমানের কাছে মেমারিতে ও চাকরি করত৷ সপ্তাহান্তে আসা যাওয়ার ফাঁকে মাঝে মাঝে দেখা হলেই মুচকি হাসি৷ ওরা কয়েকজন মিলে একটা মেসে থেকে নিজেরাই রান্নাবান্না করত, কিন্তু হাত পুড়ত না৷ ছেলেটা রান্না করত পরম মমতায়- ভালবেসে৷ কতবার ওর হাতের রান্না খেয়েছি আর তারিফ করেছি৷ লকডাউনের পর থেকে বিগত তিন মাস ও বাড়ি আসতে পারেনি, ওখান থেকে রোজ ফোনে মায়ের সাথে কথা হত। কখনও বা ভিডিও কলিং৷ বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকীতে অনলাইনে মা সোহাগী ছেলের পনেরো রকমের বিস্কুটের প্যাকেট পাঠানো, এইভাবেই চলছিল যোগাযোগ৷ ওর কাজের জায়গায় ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রটি চলত খুব চিল্ডঠান্ডায়৷ টানা আট-নঘন্টা কাজ করতে করতে নিজের শরীরের রক্ষণ বোধ করি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, আঠাশ বছরের তারুণ্য হয়তো সেদিকে নজর দেয়নি৷ জুন মাসের শেষদিকে নিঃশ্বাসের সমস্যা শুরু হয়, কিংবা তার আগেও হতে পারে, বড্ড চাপা ছেলে কাউকে বুঝতে দেয়নি৷ শেষে অসহ্য বোধ হওয়ায় গাড়ি ভাড়া করে দমদমের বাড়িতে ফেরে গত রবিবার৷ মঙ্গলবার রাতে বাড়াবাড়ি কষ্ট শুরু হয়৷ প্রচুর চেষ্টা করেও এম্বুলেন্স পাওয়া যায় না৷ রাত গভীর হয়, হতাশায় বাবা ও মায়ের তখন পাগলপারা অবস্থা৷ অবশেষে একজন দয়ালু ট্যাক্সি চালক মেডিক্যাল কলেজ যেতে রাজি হয়, এর আগে ওলা বা উবের মেডিক্যাল কলেজের নাম শুনে যেতে রাজি হয়নি৷ মেডিক্যাল কলেজ রোগী ফিরিয়ে দেয়, কারণ ওই হসপিটাল পুরোপুরি কোভিড হসপিটাল, জরুরি বিভাগ বন্ধ৷ অতঃপর নীলরতন হসপিটালে গিয়েও কোনও বেড পাওয়া যায় না, কিন্তু একটা বেঞ্চে শুইয়ে কোনওরকমে অক্সিজেন দেওয়া হয়৷ একজন ভারতীয় নাগরিক যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করদাতা- যার করের টাকায় সমস্ত রকমের নন-প্রোডাক্টিভ সার্ভিস চালু থাকে, সে মরণাপন্ন হলে রাষ্ট্রশক্তি মুখ ফিরিয়ে নেয়, এ কোন সভ্যজগতে আছি আমরা? নিয়মমাফিক ভোর হয়, হসপিটালে বেড না থাকায় বাড়ি ফেরে শোভন, কিন্তু কষ্ট বাড়তে থাকে........ বুধবার সকালে ILS হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে কিছু পরীক্ষা করা হয়, কিন্তু বেড না থাকায় রাজারহাটের চার্ণক হসপিটালে পাঠানো হয়৷ চার্ণক হসপিটাল এমার্জেন্সিতে ভর্তি করার আগে চার ঘন্টা ফুটপাথে বসিয়ে রাখে৷ অসহায় বাবা-কাকার বারবার অনুরোধেও কোনও ফল মেলে না, তারা নাকি ভারি নিয়মানুগ৷ অবশেষে চার ঘন্টা পরে রোগীকে অর্ধন্মৃত করে এমার্জেন্সিতে ঢোকানো হয়৷ পরে আইসিইউ-তে দেওয়া হয়৷ আচ্ছা বলুন তো, কোনও হসপিটাল এমার্জেন্সিতে ভর্তি করার আগে রোগীকে চার ঘন্টা অপেক্ষা করাতে পারে? এমার্জেন্সির মানে কি বদলে গেল? অতঃপর শুক্রবার বেলা দশটা কুড়ি মিনিটে হসপিটাল থেকে খবর আসে শোভন নেই, মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া কিন্তু কোভিড রিপোর্ট নেগেটিভ৷

     

    বাবা-মা'র কোল ফাঁকা করে চলে গেল 28 বছরের প্রাণোচ্ছ্বল ছেলেটি। চার্নক হাসপাতালের সামনে চার ঘন্টা অপেক্ষা করার সময় শোভন একটা টুঁ শব্দ করেনি। সমস্ত কষ্ট চেপে অপেক্ষা করেছে চিকিৎসা পাওয়ার, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার। সেই সময় বাড়ির লোক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ফুটপাতে কেন বসিয়ে রাখা হয়েছে জিজ্ঞাসা করায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের থেকে আসে এমারজেন্সির বাইরেটাকে আপনি ফুটপাত বলতে পারেন না।' যতক্ষণ না শোভনের কোভিড রিপোর্ট আসে, ততক্ষণ ঠাঁয়ে তিনি বসে রইলেন হাসপাতালের বাইরে। নাম এমারজেন্সি ডিপার্টমেন্ট’, তার সামনে মুমূর্ষু এক রোগীকে কোন নিয়মে 4 ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়? মৃত্যুমুখী রোগীকে কেন সরকারি হাসপাতালের দোরগোড়ায় গিয়ে বিতাড়িত হতে হয় বারংবার? কোথায় প্রশাসন? কোথায় রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা? এই মৃত্যুতে দোষ আসলে কার? পাড়ার সকলের মুখে এই প্রশ্নগুলোই ঘুরছে কাল থেকে।

     

     


    অর্যমা দাস - এর অন্যান্য লেখা


    বর্তমান থেমে গিয়েছে, ভবিষ্যৎ কী?? আমরা জানি না।

    সোশাল মিডিয়া জুড়ে যুবসমাজের এক বিশাল অংশকে এই ‘করোনা উৎসব'কে ব্যঙ্গ করতে দেখলাম।

    করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও পরিবেশ রক্ষার মতোই দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর পদক্ষেপ করেছে সিকিম রাজ্য সরকার।

    টিভিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের কষ্ট দেখলেই চন্দনা দির দু-চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ে

    শহরের অচেনা 'গানওলা' স্বপন সরকার

    মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ায় লজ্জা, অসম্মান বা অসঙ্গতির কোনও জায়গাই নেই।

    শোভন চলে গেল, করোনা নয়, বিনা চিকিৎসায়-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested