×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বিজেপি-র হয়ে ভোটের প্রচারে আম্বানির রিলায়েন্স

    দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ | 16-03-2022

    নিজস্ব ছবি।

    রিলায়েন্সের অর্থে পুষ্ট সংস্থা ফেসবুকে বিজেপির প্রচারাভিযানকে বাড়িয়ে তুলছে

     

     আইনি ফাঁকফোকর, ফেসবুকের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মের ব্যবহার একটি রিলায়েন্স অধিকৃত সংস্থাকে বিজেপির প্রচারের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার ছাড়পত্র দিয়েছে

     

    কুমার সম্ভব এবং নয়নতারা রঙ্গনাথন

     

     

    2019 সালের লোকসভা নির্বাচনে, ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন হিন্দু তপস্বীকে প্রার্থী করেছিল। সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার একটি আসনের জন্য বিজেপি প্রজ্ঞা ঠাকুরকে প্রার্থী হিসাবে বেছে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ফেসবুক একটি বিজ্ঞাপন দেখিয়েছিল, যা একটি সংবাদ প্রতিবেদনকে নকল করে বানানো হয় এবং তার শিরোনামে একটি মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল।

     

    বিজ্ঞাপনটিতে মিথ্যা গাবি করা হয়েছিল যে, প্রজ্ঞা ঠাকুরকে তার মোটরসাইকেলে বিস্ফোরক রাখার অভিযোগ থেকে মুক্ত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, মহারাষ্ট্রের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর মালেগাঁওয়ে এই বিস্ফোরণে ছ’জন মানুষ নিহত হন। একদিনে এই বিজ্ঞাপনটি প্রায় 300,000 মানুষ দেখেছিলেন। বিচারাধীন অভিযুক্ত প্রজ্ঞা ঠাকুর চিকিৎসার জন্য জামিনে থাকাকালীন নির্বাচনে জিতেছিলেন।

     

     

    স্ক্রিনশট 1: ফেসবুকের অ্যাড লাইব্রেরি থেকে স্ক্রিনগ্র্যাব দেখায় নিউজ ( (NEWJ)একটি বিজ্ঞাপনে প্রজ্ঞা ঠাকুর সম্পর্কে একটি মিথ্যা দাবি করেছিল

     

     11 এপ্রিল ভোট শুরু হওয়ার এক মাস আগে, ফেসবুক দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি রাহুল গান্ধীকে নিয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেখিয়েছিল। সেখানে সন্ত্রাসবাদের প্রতি নমনীয় হওয়ার জন্য বিজেপিকে অভিযুক্ত করে রাহুল গান্ধী বলেছিলেন যে, শেষবার 1990 -এর শেষ দিকে বিজেপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা ভারতে নিষিদ্ধ হওয়া পাকিস্তানের এক সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান মাসুদ আজহারকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছিল। গান্ধী সেই বক্তৃতায় ব্যঙ্গাত্মকভাবে মাসুদ আজহারকে ‘আজহার জি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

     

    যে বিজ্ঞাপনটি প্রচার করা হয়েছিল তাতে ইতিহাসের সেই জঘন্য প্রেক্ষাপটের কথা গান্ধীর বক্তৃতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাহুল কোন প্রেক্ষিতে এই কথা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরিবর্তে, নিউজ (NEWJ) নামে একটি লোগো সহ ঘটনাটিকে সংবাদ প্রতিবেদনের মতো সাজিয়ে একটি শিরোনাম দিয়ে চালানো হয়েছিল, যেখানে রাহুল মাসুদ আজহারকে ‘জি’ বলে ডাকেন। এই ভিডিও চার দিনে প্রায় 650,000 জন মানুষ দেখেছিলেন।

     

     

    স্ক্রিনশট 2: নিউজ (NEWJ) রাহুল গান্ধীর মাসুদ আজহারের ব্যঙ্গাত্মক উল্লেখ সম্পর্কে একটি বিজ্ঞাপন চালায় | সূত্র: ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি

     

    ফেসবুকের অ্যাড লাইব্রেরি অনুসারে, ‘নিউজ (NEWJ)’ নামক একটি ফেসবুক পেজ ফেসবুকের মূল সংস্থা মেটার প্ল্যাটফর্ম জুড়ে দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলি ব্রাউজ করার জন্য একটি গ্রাফিকাল ইন্টারফেসে উভয় বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থপ্রদান করে থাকে। নিউ ইমার্জিং ওয়ার্ল্ড অফ জার্নালিজম লিমিটেডের সংক্ষিপ্ত ‘নিউজ’ (NEWJ) হল ভারতের বৃহত্তম টেলিকম এবং ইন্টারনেট সংস্থা Jio Platforms Ltd-এর একটি সহযোগী সংস্থা, যা শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপের মালিকানাধীন।

     

     

    2019 সালের সংসদীয় নির্বাচন এবং নয়টি রাজ্যের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়াতে দেশের বহুজাতিক সংস্থাগুলি লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক প্রার্থীর হয়ে বিজ্ঞাপন দেয়, যেগুলি সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর অর্থানুকূল্যে তৈরি করা হয়নি। ভারতের নির্বাচন কমিশন একপাক্ষিক আচরণ এবং ফেসবুকের নিয়ম ও প্রক্রিয়াগুলির ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েই এই কাজ করা সম্ভব হয়েছিল।

     

     

    বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে ফেসবুক নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণে যখন এই সমস্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিজ্ঞাপনগুলিকে বন্ধ করছিল, তখন প্রধানত বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস প্রদত্ত বিজ্ঞাপনগুলির ওপরেই কোপ নেমে আসে, কিন্তু নিউজ (NEWJ)-এর মতো ফেসবুক পেজগুলোকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

     

     

    ভারতের একটি অলাভজনক মিডিয়া সংস্থা দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ ফেব্রুয়ারি 2019 থেকে নভেম্বর 2020 পর্যন্ত এই এক বছরে ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে দেওয়া মোট 536,070টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে মূলত দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ফেসবুকের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নীতির প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য। ভারতে ফেসবুকের Ad Library Application Programming Interface (API) -এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এই 22 মাসের মধ্যে 2019-এর লোকসভা নির্বাচন এবং নয়টি রাজ্যের নির্বাচন হয়েছিল। এর নির্বাচনগুলিতে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম পদ্ধতিগতভাবে বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনী গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমিয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বিজেপিকে অনেক বেশি সুবিধা দিয়েছে।

     

     

    সিরিজের প্রথম অংশে আমরা দেখাব কীভাবে ফেসবুক ভারতের বৃহত্তম বহুজাতিক সংস্থার অর্থে পুষ্ট একটি সংস্থা আইনি ফাঁক দিয়ে বিজেপির সমর্থনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিজ্ঞাপনগুলি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। পরবর্তী অংশগুলিতে দেখানো হয়েছে বিজেপির সহযোগী বিজ্ঞাপনগুলির অন্দরমহল এবং সেগুলি কীভাবে কাজ করে! এই অংশে আরও দেখানো হয়েছে কীভাবে ফেসবুকের অ্যালগরিদম নির্দেশাবলী এবং একটি সফ্টওয়্যারে কোড করা নিয়মগুলি থেকে নির্বাচনের সময় বিজেপিকে তার অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে রেখেছিল।

     

     

    বিজ্ঞাপনকে সংবাদ হিসাবে প্রচার করা হয়

    নিউজ (NEWJ) নিজেদেরকে একটি স্টার্ট-আপ ‘সংবাদ’ সংস্থা বলে দাবি করে, যারা গ্রাম এবং ছোট শহরের মানুষদের কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবর পৌঁছে দেবে বলে জানায়। বাস্তবে, এই কোম্পানিটি ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে এমন ভিডিও প্রকাশ করার জন্য বিজ্ঞাপনের স্থান কিনে নেয়, যেগুলি আসলে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন। কিন্তু এই বিজ্ঞাপনগুলিকে একটি অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু সহ সংবাদের গল্প হিসাবে প্রচার করা হতে থাকে- যেগুলির মূল লক্ষ্য বিজেপির হয়ে প্রচার করা, ভুল তথ্য প্রচার করা, মুসলিম বিরোধী মনোভাব উস্কে দেওয়া এবং বিরোধী দলগুলিকে হেয় করা।

     

     

    ফেসবুক ব্যবহারকারী বা পেজগুলির দ্বারা তৈরি করা পোস্টগুলি, যা সাধারণত বন্ধু এবং ফলোয়ারদের টাইমলাইনে দেখা যায়, টাকা দিয়ে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলি প্রত্যাশিত জনগোষ্ঠীর বাইরেও বৃহত্তর ব্যবহারকারীদের কাছে ফেসবুক পৌঁছে দেয়। বিজ্ঞাপনদাতারা ফেসবুকের দ্বারা সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ব্যবহারকারীদের অবস্থান, জনসংখ্যা এবং আচরণের মতো বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যবহারকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারে। 2019 সালের নির্বাচনের আগে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার দাবি করে, ফেসবুক তাদের বিজ্ঞাপন লাইব্রেরিতে ভারতের ‘রাজনীতি সম্পর্কিত সমস্ত বিজ্ঞাপন’ ট্যাগ করা এবং প্রদর্শন করা শুরু করে।

     

     

    অ্যাড লাইব্রেরি দেখায় যে নিউজ (NEWJ) পেজটি সংসদীয় নির্বাচনের আগে তিন মাসে প্রায় 170টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, যার বেশিরভাগই হয় বিজেপি নেতাদের মহিমান্বিত করে, নইলে মোদীর প্রতি ভোটারদের সমর্থনের পূর্বানুমান করে, অথবা জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে দিয়ে, কিংবা বা বিরোধী নেতাদের এবং তাদের সমাবেশগুলিকে উপহাস করে।

     

     

    এই বিজ্ঞাপনগুলি খুবই সচেতন ভাবে ভারতের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সম্পর্কিত অরাজনৈতিক, তথ্যমূলক বা অনুপ্রেরণাদায়ক নানা ভাইরাল ভিডিও – যেমন একজন প্রতিবন্ধী মহিলা তার পা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিচ্ছেন, বা একজন পুলিশ অফিসার একজন প্রতিবন্ধীকে খাওয়াচ্ছেন – এমন কিছু ফেসবুকের নিরলস বিজ্ঞাপন-স্রোতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এগুলিকেই নিউজ (NEWJ) তার সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলিতে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য পোস্ট করেছিল।

     

     

    বিজ্ঞাপনদাতা

    নিউজ (NEWJ)-এর প্রতিষ্ঠাতা শলভ উপাধ্যায়ের রিলায়েন্স এবং বিজেপি উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা উমেশ উপাধ্যায় রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট এবং মিডিয়া ডিরেক্টর এবং পূর্বে রিলায়েন্স-মালিকানাধীন নেটওয়ার্ক-18 গ্রুপে তিনি নিউজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তার কাকা সতীশ উপাধ্যায় একজন বিজেপি নেতা এবং পার্টির দিল্লি ইউনিটের প্রাক্তন সভাপতি।

     

     

    তবে, নিউজ (NEWJ) বিজেপির সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের কথা স্বীকার করে না এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন তৈরি বা প্রকাশ করার জন্য নিউজ (NEWJ)-কে অর্থ প্রদান করার কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। 2018 সালের জানুয়ারিতে এর সূচনা থেকে মার্চ 2020 পর্যন্ত, যে সময়ের জন্য আমরা নিউজ (NEWJ)-এর আর্থিক আয়-ব্যয়ের পর্যালোচনা করেছি, সেই সময়ে এটি সংবাদ সংক্রান্ত কোনও ক্ষেত্র থেকে এমনকি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ফি হিসাবেও কোনও রাজস্ব অর্জন করেনি। পরিবর্তে, এটি বিজ্ঞাপনের জন্য রিলায়েন্স গ্রুপের বিনিয়োগকৃত অর্থ ব্যয় করেছে।

     

     

    নির্দিষ্ট একজন রাজনৈতিক প্রার্থীর পক্ষ অবলম্বন করে, কিন্তু সরাসরি তার অনুমাদন বা অনুমতি না নিয়ে সারোগেট বা ‘ভৌতিক’ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা কিন্তু ভারতীয় আইন মোতাবেক একটি অপরাধ। এমন আইনি সংস্থান রাখার কারণ রাজনৈতিক দলগুলি যাতে তাদের দেওয়া সমস্ত তথ্যের জন্য দায়বদ্ধ থাকে এবং বিজ্ঞাপনের জন্য অজানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত অর্থের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ-এর তরফে তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) নির্বাচন কমিশনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে দেখা যায় উপরিউক্ত নিষেধাজ্ঞা ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়ার জন্য প্রযোজ্য নয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আইনের এত বড় গলদ সম্পর্কে কমিশন যে অবহিত নয়, এমন কিন্তু নয়!

     

     

    এই গলদের সুযোগ নিয়েই ফেসবুকের মূল সংস্থা মেটা-ও, এই নিয়মটি তাদের নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেনি। উল্টে নির্বাচন চলাকালীন রিলায়েন্সের অর্থপুষ্ট নিউজ (NEWJ)- সংস্থাকে ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে নীরবে বিজেপি এবং তার প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করার সুযোগ করে দিয়েছে।

     

     

    এটি ছাড়াও, হুইসেল-ব্লোয়ার (গোপনে তথ্য সরবরাহকারী) ফ্রান্সেস হাউগেন দ্বারা ফাঁস হওয়া নথিগুলি থেকে সম্প্রতি জানা গেছে যে, ফেসবুক লোকসভা নির্বাচনের সময় সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে কঠোর বিধিনিষেধ হওয়া রুখতে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য ইন্টারনেট এবং মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (IAMAI) সংস্থা দু’টির ওপর চাপ বাড়িয়ে গেছে৷

     

     

    যদিও ফেসবুক দাবি করেছে যে, লোকসভা নির্বাচনের আগে তারা ভূতুড়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। তবে এক্ষেত্রে একমাত্র চাঁদমারি হয়েছে সেই সন বিজ্ঞাপনদাতাই, যারা কংগ্রেসের হয়ে প্রচার করেছিল। একটি বহুল প্রচারিত ফেসবুকিয় ব্যবস্থা হল “Coordinated Inauthentic Behaviour”, যেটি বিভিন্ন দেশে সক্রিয়। কংগ্রেস দলের হয়ে প্রচার করে এবং তা প্রকাশ্যে অস্বীকার করে এমন 687টি ফেসবুক পেজ এবং অ্যাকাউন্টকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির হয়ে প্রচার করা মাত্র 1টি পেজ ও 14টি অ্যাকাউন্টকে ফেসবুক মুছে দিয়েছিল। ঘটনাচক্রে এই পেজ এবং অ্যাকাউন্টগুলি সিলভার টাচ নামের একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার মালিকানাধীন, যারা আবার তাদের বিজেপি-যোগের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে না।

     

    ইমেলে পাঠানো একাধিক প্রশ্নের উত্তরে মেটা কর্তৃপক্ষ নিউজ (NEWJ)-এর রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের বিষয়ে জানায় যে, তারা কারও রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে তাদের নিয়মবিধি সমানভাবে অনুসরণ করে চলে। ফেসবুকের নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করা কিংবা বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনও বিশেষ ব্যক্তির মতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তা সেই ব্যক্তির মত কোম্পানির নীতির সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ হোক বা না হোক।

     

     

    মেটার তরফে আরও জানানো হয়, ফেসবুকে বিধিবদ্ধ অনৈতিক আচরণের মোকাবিলায় তারা তাদের কাজ 2019 এর পরেও জারি রেখেছে এবং এই কাজ তারা থামাবে না।

     

     

    সেই সময় একটি সাক্ষাত্কারে, ফেসবুকের সাইবার সিকিউরিটি পলিসির প্রধান ন্যাথানিয়েল গ্লিচার বলেছিলেন: ’’আমরা এখানে এমন পেজ, গ্রুপ খুঁজছি যেগুলোকে স্বাধীন দেখানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, কিন্তু আসলে সেগুলি কোনও সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত এবং তারা এটি লুকোনোর চেষ্টা করেছে।‘’ তিনি উদাহরণ দিয়ে এমন কিছু ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলিকে সংবাদ সরবরাহকারী ফেসবুক পেজ হিসাবে দেখানো হলেও আদতে সেগুলি রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল।

     

     

    ‘’ফেসবুকের প্রাক্তন কর্মচারী সোফি ঝাং, যিনি পরে হুইসেল-ব্লোয়ার হয়েছিলেন, দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভকে বলেছেন, এই ঘোষণার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, ফেসবুক অভ্যন্তরীণভাবে একটি দেশের মধ্যে হওয়া অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে।‘’মোদ্দা কথা, প্রাথমিকভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ থাকা ফেসবুক পেজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও 2019-এর নির্বাচনের সময় এবং পরে অন্য কোনও দলের হয়ে প্রচার করা পেজগুলির বিরুদ্ধে অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

     

     

    নিউজ (NEWJ)-এর পেজে কোনওরকম ঝাড়াই-বাছাই ছাড়াই বিজেপি এবং সেই দলের মহিমাকীর্তন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের সময় এমন প্রচারমূলক পোস্ট এবং বিজ্ঞাপনের সুবাদে বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হয়েছে।

     

     

    অ্যাড আর্কাইভ ডেটা অনুসারে ফেব্রুয়ারি 2019 থেকে নভেম্বর 2020 পর্যন্ত-এই 22 মাসে নিউজ (NEWJ) দেশের অন্তত 10টি নির্বাচনে 718টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দিয়েছে, যেগুলি ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সম্মিলিতভাবে 290 মিলিয়নেরও বেশি বার দেখেছেন। NEWJ কোম্পানি এই বিজ্ঞাপনগুলির জন্য 52 লাখ টাকা খরচ করেছে।

     

     

    এই বিজ্ঞাপনগুলিতে মধ্যে অনেকগুলি মুসলিম-বিরোধী এবং পাকিস্তান-বিরোধী মনোভাবকে উস্কে দেওয়া হয়েছে, বিজেপি বিরোধী এবং বিজেপির সমালোচকদের নিশানা করা হয়েছে এবং মোদী সরকারের প্রশংসা করেছে।

     

     

    যেমন 2019 সালের এপ্রিল মাসে লোকসভা নির্বাচনের এক মাস আগে মোদী ভারতের পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে পাকিস্তানকে সতর্ক করে একটি নির্বাচনী সমাবেশে ‘জাতীয়তাবাদী’ আবেগকে উস্কে দিয়েছিলেন। মোদী বলেছিলেন, ‘"পাকিস্তানের হুমকিতে ভয় পাওয়ার নীতি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। প্রতিদিন ওরা বলত, ‘আমাদের পারমাণবিক বোমা আছে, আমাদের পারমাণবিক বোমা আছে’। তাহলে আমাদের কী আছে? আমরা কি ওটা দীপাবলির জন্য রেখেছি?’’ এর প্রতিক্রিয়ায়, জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যে মোদীর প্রতিপক্ষ মেহবুবা মুফতি টুইট করে বলেছিলেন, “ভারত যদি দীপাবলির জন্য পারমাণবিক বোমা না রাখে, তবে স্পষ্টতই পাকিস্তানও ঈদের জন্য পারমাণবিক বোমা রাখেনি। জানি না কেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে এতটা নীচে নামতে হয়।’’

     

     

    মোদীর বক্তৃতার প্রসঙ্গ ছাড়াই মুফতির টুইট ব্যবহার করে, একটি নিউজ (NEWJ) বিজ্ঞাপনে তাকে এমন একজন হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি পাকিস্তানের পক্ষে। ‘"পাকিস্তানের প্রতি মেহবুবার ভালবাসা দ্বিতীয়বার প্রকাশ পেয়েছে। মেহবুবা মুফতি আবার পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন,’’ এমন ভাবে সেই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল।

     

     

    স্ক্রিনশট 3: নিউজ (NEWJ)-এর বিজ্ঞাপনে মুফতিকে এমন একজন হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। সূত্র: ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি

     নিউজ (NEWJ)বিজ্ঞাপনগুলি হিন্দু ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত আনার চেষ্টা করেছিল, যা বিজেপির অঘোষিত নীতি। 2019 সালের মে মাসে যখন বিশ্বব্যাপী অনলাইন রিটেল জায়ান্ট অ্যামাজনের বিরুদ্ধে  ‘#BoycottAmazon’ ট্যুইটারে ট্রেন্ডিং ছিল, তখন ভারতের অনলাইন খুচরো বাজারে রিলায়েন্সের প্রতিযোগী এই সংস্থাটিকে, হিন্দু দেবদেবীর ছবি সহ পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেই সময় নিউজ (NEWJ)-এর একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয় ‘ভারত আমাজনকে তার শক্তি বুঝিয়ে দিয়েছে। জনগণের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। দেব-দেবীর পণ্য নিয়ে আসা, ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

     

     

    স্ক্রিনশট 4: নিউজ (NEWJ)-এর একটি বিজ্ঞাপন অ্যামাজনে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলিতে হিন্দু দেবদেবীর ছবি জড়িত একটি বিতর্কের মধ্যে অন্যতম। সূত্র: ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি

     

    2019 সালের মে মাসে লোকসভা নির্বাচনের পরে, নিউজ (NEWJ) এমন গল্পগুলি চালিয়েছি,ল যা সরকারী নীতি এবং বিজেপি নেতাদের প্রশংসা করেছে, বা একটি নতুন হুমকি সম্পর্কে অন্যদের ভয় দেখাতে সফল।

     

     

    2019 সালের ডিসেম্বর মাসে যখন বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম ব্যতীত প্রতিবেশী দেশের অন্যান্য ধর্মের দেশন্তরী মানুষদের শরণার্থী তকমা দিয়ে নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। কিন্তু 2020 সালের নভেম্বরে নিউজ (NEWJ) ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন চালায়, যেটিতে বাংলাদেশে হিন্দুদের বাড়িতে হামলার ভিডিও দেখানো হয়েছে। ভারতের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দেওয়া হয় এবং বুঝিয়ে দেওয়া হয় কেন তাদের নতুন নাগরিকত্ব আইনকে সমর্থন করতে হবে। তাদের বক্তব্যের প্রতিপাদ্য বিষয়, ""সংখ্যালঘু হিন্দুরা সবসময়ই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মুসলমানদের ক্রোধের শিকার হয়েছে।’’

     

     

    স্ক্রিনশট 5: CAA নিয়ে আন্দোলন চলার সময় (NEWJ)-এর এই বিজ্ঞাপনে অভিযোগ করা হয়, বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুরা ফ্রান্সে শার্লি এবদো সংক্রান্ত প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়। সূত্র: ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি

     

    যখন গায়িকা রিহানা এবং অন্যান্য সেলিব্রিটিরা যখন মোদী সরকারের নয়া তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত দেশের কৃষকদের পক্ষে কথা বলেছিলেন, তখন  নিউজ (NEWJ)-এর একটি বিজ্ঞাপনে এই মর্মে প্রশন তোলা হয় যে,  ‘সেলেবরা’ আরোপিত কৃষক আন্দোলনের পক্ষে সরব হলেও ভারত ‘আক্রান্ত’ হলে তারা নীরব থাকেন কেন?

     

     

    স্ক্রিনশট 6: এখন প্রত্যাহার করা তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিক্ষোভের মধ্যেই, নিউজ (NEWJ) রিহানার মতো সেলিব্রিটিদের বিরুদ্ধে একটি বিজ্ঞাপন চালায় যারা ভারতীয় কৃষকদের পক্ষে কথা বলেছিলেন। সূত্র: ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি

     

    পদ্ধতিগত বিনিয়োগ

    শলভ উপাধ্যায় এবং তার বোন দীক্ষা 2018 সালের জানুয়ারিতে 100,000 টাকা পরিশোধিত মূলধন সহ একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে নিউজ (NEWJ) তৈরি করেন। নভেম্বরের মাঝামাঝি, রিলায়েন্স গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানি, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড হোল্ডিংস লিমিটেড (RIIHL) নিউজ (NEWJ)-এর 75 শতাংশ কিনে নেয়। তারপরে এটি বিনিময়যোগ্য ঋণপত্রের মাধ্যমে কোম্পানি নিউজ-কে 8.4 কোটি টাকা ঋণ দেয়।

     

     

    নগদ অর্থের বিনিময়ে নিউজ (NEWJ) মূলত একটিই কাজ করেছে – সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও তৈরি করা এবং প্রকাশ করা, যা বিজেপিকে প্রচার পেতে সাহায্য করে, এবং ফেসবুক এবং YouTube শোতে নিউজ (NEWJ)প্রোডাকশনের বিজ্ঞাপনগুলির প্রচার বাড়াতে সাহায্য করে। নিউজ (NEWJ) মার্চ, 2019-এ আর্থিক বছর শেষ করেছে সামান্য 33 লাখ টাকার রাজস্বের মোট 2.2কোটি টাকা লোকসান করেছে।

     

     

    পরের বছর রিলায়েন্স নিউজ (NEWJ)-এ ঋণপত্রের মাধ্যমে আবার 12.5 কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। 2020 সালের মার্চে শেষ হওয়া আর্থিক বছরের জন্য, নিউজ (NEWJ)কোনও রাজস্ব রেকর্ড করেনি, কিন্তু 2.7কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী প্রচারমূলক ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের 60 লক্ষ টাকার থেকেও বেশি। সেই সময়ে, RIIHL-এর অংশীদারিত্ব রিলায়েন্স গ্রুপের অন্য একটি কোম্পানি, দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর, Jio Platforms Ltdকিনে নিয়েছিল। নতুন কোম্পানির দ্বারা অধিকৃত হওয়ার পর, 2021 সালের মার্চে শেষ হওয়া আর্থিক বছরে নিউজ 90.2কোটি টাকা আয় করেছে।

     

     

    Jio-র অংশীদারিত্ব কিনে নেওয়ার ঠিক ছয় দিন আগে, নিউজ (NEWJ) তার নয়া ‘বিনিয়োগকারী’কে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাদের ‘আর্টিকেলস অফ অ্যাসোসিয়েশন’ সংশোধন করেছে। এক্ষেত্রে রিলায়েন্স গ্রুপ কোম্পানির "কন্টেন্ট নির্দেশিকা’ অনুমোদন করার অধিকার রয়েছে, যে নিউজ (NEWJ) কোন খবর তৈরি করবে এবং কী প্রচার করবে। 2021 সালের মার্চে শেষ হওয়া আর্থিক বছরে Jioনিউজ (NEWJ)-কে 0.0001 শতাংশ বার্ষিক সুদের হারে আরও 8.4 কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। Jioফেসবুককে বিনিয়োগকারী হিসাবে গণ্য করছে।

     

     

    নিউজ (NEWJ) দাবি করেছে, তাদের সংক্ষিপ্ত আকারের ভিডিওগুলি, যা তারা ‘একচেটিয়াভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে’ প্রকাশ করে থাকে, সেগুলি মোট 4 লাখ মিনিটের ধরে দেখা হয়েছে এবং 2.2 কোটিরও বেশি মানুষ এগুলি দেখেছেন, যা ‘বিশ্বের জনসংখ্যার তিনগুণ।’

     

     

    দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভের প্রশ্নের উত্তরে NEWJ-এর মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক শলভ উপাধ্যায় বলেন, "সোশাল মিডিয়ার অন্যতম বৃহৎ সংবাদ পরিবেশক হিসাবে NEWJ স্বচ্ছ এবং কার্যকরী নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর দায়বদ্ধ। তাছাড়া স্বচ্ছতা রক্ষার স্বার্থে আমরা মেটার-র কমিউনিটি গাইডলাইন এবং বিজ্ঞাপন নীতিকে মান্য করে চলি।"

     

    নির্বাচন কমিশন আর ফেসবুক চোখ বন্ধ করে আছে

    অর্থ শক্তি থেকে নির্বাচনকে দূরে রাখতে, ভারতীয় নির্বাচনী আইনে একজন প্রার্থীর প্রচারে খরচের পরিমাণকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর সঙ্গে কোনও ঘোষিত সম্পর্ক ছাড়াই কোনও তৃতীয় পক্ষ যদি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওই প্রার্থীর বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থ প্রদান করে, নির্বাচন কমিশন তা প্রার্থীর নিজস্ব খরচ হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। কমিশন এমন উদাহরণগুলির ক্ষেত্রেও তদন্ত করে, যেখানে অর্থপ্রদানের বিজ্ঞাপনগুলি মূলস্রোতের মিডিয়াতে সংবাদ হিসাবে পরিবেশিত হয়। যদি দেখা যায় যে ‘সংবাদ’ -এর একটি অংশে প্রকৃতপক্ষে কোনও প্রার্থীর প্রচারের জন্য অর্থ প্রদান করা হয়েছে, কমিশন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের প্রকৃত বা ধারণাগত ব্যয়কে যোগ করে। তবে এই নিয়মগুলি সোশ্যাল মিডিয়াতে দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলিতে প্রয়োগ করা হয় না।

     

     

    2013 সালে কমিশন সমস্ত রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং তাদের অনুমোদিত এজেন্টদের সোশাল মিডিয়া বিজ্ঞাপনগুলির জন্য কমিশনের কাছে আগাম অনুমতি এবং সেগুলি বাবদ খরচের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু তৃতীয় পক্ষের বিজ্ঞাপনগুলিকে এই নিয়ম থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল।দল বা প্রার্থীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নয় এমন সংস্থাগুলিকে এই নিয়মের বাইরে রেখে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিজ্ঞাপনের জন্য উইন্ডোটি খোলা রাখা হয়েছিল।

     

     

    25 অক্টোবর, 2013-এর আদেশনামায়, কমিশন বলেছিল যে সোশ্যাল মিডিয়া ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশ এবং বিজ্ঞাপনগুলি এই মাধ্যমেও একইভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। তবে এটি যোগ করা হয় যে, তারা এটি এখনও বিবেচনা করছেন যে প্রার্থী এবং তাদের দল ব্যতীত অন্য লোকেদের পোস্ট করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিজ্ঞাপনগুলির সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়।

     

    এই বছরের শুরুতে দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের আরটিআই প্রশ্নের জবাবে, কমিশন ‘স্বতঃপ্রণোদিত নৈতিক বিধি’কে উদ্ধৃত করেছে, যা ইন্টারনেট এবং মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (আইএএমএআই) মার্চ 2019 সালে ‘নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য খসড়া করেছিল। এই নিয়ম রাজনাতিক বিজ্ঞাপনের বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি। ফলে এই আইনি গলদের সুযোগে লোকসভা এবং নয়টি রাজ্যের নির্বাচনের সময় এই বিধিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছিল।

     

     

    নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনার সম্মুখীন হওয়ার পরে, ফেসবুক যারা রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিচয় এবং ঠিকানা যাচাই করার জন্য 2018 সালে একটি নীতি চালু করে। এই নীতি মোতাবেক এই ধরনের সমস্ত বিজ্ঞাপনদাতাদের বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য কে অর্থ প্রদান করছে তা ঘোষণা করতে বলা হয় এবং বিজ্ঞাপন লাইব্রেরিতে তহবিল সংস্থার বিশদ বিবরণ দেখাতে বলা হয়। ফেসবুক অবশ্য বিজ্ঞাপনদাতার দেওয়া পরিচয় সত্য কিনা, তা যাচাই করে না। কোনও রাজনৈতিক দল বা তার প্রার্থীদের পক্ষে সেই বিজ্ঞাপনগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা-ও পরীক্ষা করে না।

     

     

    ফেসবুক ‘যোগ্য’ সংবাদ সংস্থাগুলির দেওয়া সমস্ত বিজ্ঞাপনকে যাচাই করা কিংবা তহবিল প্রকাশ করার বাধ্যবাধ্যকতা থেকে ছাড় দেয়। ফেসবুক নিউজ (NEWJ)-এর বিজ্ঞাপনগুলিতে এই ছাড়গুলি প্রয়োগ করেনি। অন্য কথায়, নিউজ (NEWJ) ফেসবুকের নিজস্ব মানদণ্ড অনুসারে একটি স্বাধীন সংবাদ সংস্থা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি।

     

    রিপোর্টাস কালেকটিভের প্রশ্নের উত্তরে নিউজ (NEWJ)-এর তরফে শলভ উপাধ্যায় তাঁর সংস্থা নিউজ-কে আল জাজিরার মতো লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

     

    তাঁর কথায়, ""আমরা আমাদের সংস্থার সংবাদকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে মেটা (ফেসবুকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা)-র বিজ্ঞাপন লাইব্রেরি ব্যবহার করে থাকি, ঠিক যেমন ব্রুট কিংবা AJ+ -এর মতো সংস্থা-ও এটিকে ব্যবহার করে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হল আরও বেশি মানুষের কাছে, তাদের পছন্দমতো কিন্তু তথ্যভিত্তিক সংবাদ পৌঁছে দেওয়া।''

     

    রিলায়েন্স গোষ্ঠীর দুই সংস্থা RIIHL, JPL, ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে রিপোর্টার্স কালেকটিভের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে বারবার জানতে চাওয়া হলেও কোনও উত্তর মেলেনি।

     

     

    রিলায়েন্স-প্রচারিত নিউজ (নিউজ (NEWJ) কি একমাত্র সত্তা যা গোপনে ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিজেপিকে তার সংস্থান প্রকাশ না করে প্রচার করেছে? সিরিজের পার্ট 2 অন্যদের প্রকাশ করবে যারা ফেসবুক-এ সারোগেট বিজ্ঞাপন ইকোসিস্টেমের অংশ।

     

     

    (কুমার সম্ভব এবং নয়নতারা রঙ্গনাথন দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভের (www.reporters-collective.in) সদস্য। এই লেখাটি মূলত আল জাজিরা (www.aljazeera.com)-তে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল)

     


    দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ - এর অন্যান্য লেখা


    ফেসবুকের অ্যালগোরিদমে সমান সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য বিজেপি-র বিজ্ঞাপনের খরচ অন্যদের থেকে কম!

    শিখন্ডী কোম্পানি খাড়া করে লোকসভা সহ বিভিন্ন ভোটে বিজেপি-র হয়ে প্রচারে কোটি কোটি টাকা ঢেলেছে জিও!

    লোকসভা আর ন'টি রাজ্য বিধানসভা ভোটের সময় খবরের মোড়কে নির্বাচনী প্রচারে লাভবান হয়েছে বিজেপি!

    নিজস্ব বিচারে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করলে ফেসবুকে বিজ্ঞাপনের রেট কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে বিজেপি দলের হিসে

    বিজেপি-র হয়ে ভোটের প্রচারে আম্বানির রিলায়েন্স-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested