×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • গর্ভধারিণী: একটি প্রজন্ম পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক

    শুভস্মিতা কাঞ্জী | 23-02-2021

    বইয়ের প্রচ্ছদ

    "আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন, মানুষ হইতে হবে এই যার প।' কুসুমকুমারী দাশের আদর্শ ছেলে কবিতার প্রতিটা ছত্র, যা বর্তমান রাজ্য তথা দেশের রাজনীতি, সমাজের অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। কথার ফুলঝুরি, প্রতিশ্রুতির সাজি ভরে থাকে কিন্তু কাজ? 

     

    সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস গর্ভধারিণী তাই আজও ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। তখনকার রাজনৈতিক চিত্র, সমাজের অবস্থার সঙ্গে বর্তমান সময় যেন একদম হুবহু মিলে যাচ্ছে। শুধু নাম, দল এগুলো বদলে গিয়েছে। শুধু সামাজিক অবস্থান না, আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির ছোটখাটো ঘটনাও গর্ভধারিনী উপন্যাসের চার চরিত্রের বাড়ির সঙ্গে মিলে যায়। আজও মধ্যবিত্ত মানে একরাশ ভয়, লোক-লজ্জা, নিত্য ঝামেলা, অশান্তি। কিন্তু তারপরেও একসঙ্গে একই ছাদের তলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভাল রেজাল্ট করার চাপ, ইঁদুর দৌড়ে নামতেই হবে বারবার তা বাড়ি থেকে স্মরণ তখনও করিয়ে দেওয়া হতো, আজও হয়। সঙ্গে উচ্চবিত্ত পরিবারে উদ্দাম জীবন, বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, তার অবহেলা যে আজও প্রকট সেদিনের মতোই তাও অজানা নয় কারও। 

     

    গর্ভধারিণী রচনার সময়কাল 1986এক রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে তখন। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। টাকা দিয়ে নানান বেআইনি কাজ করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে আজও। মিটিং মিছিলে শহর অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বারবার। একদল চাইছে গদি দখল করতে। এলিট শ্রেণী আছে তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে। আর কিছু মানুষ আছে যাদের কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ হয় না। কী মিল পাচ্ছেন? চেনা চেনা লাগছে তো পরিস্থিতিটা? হ্যাঁ আমারও লাগছিল যখন উপন্যাসটা পড়ছিলাম। কী অদ্ভুত মিল! এখনও একই পরিস্থিতি এই রাজ্যে। শাসক দল চাইছে গদি সামলে রাখতে। নৈরাজ্যে ছেয়ে গেছে চারিদিক, তোলাবাজি থেকে শুরু করে টেট কেলেঙ্কারি। ছাত্র যুবরা ক্ষেপছে। ঠিক যেমনটা জয়িতা, আনন্দ, সুদীপ, কল্যাণরা ক্ষেপেছিল। আমূল বদলে দিতে চেয়েছিল এই ঘুণে ধরা সমাজটাকে। তারা মরচে ধরে যাওয়া, ধুঁকতে থাকা সমাজের বিবেকবোধকে নাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ভীষণ রকম। কিন্তু পেরেছিল কি? না। উল্টে তকমা জুটেছিল "সন্ত্রাসবাদী'। আজও সেই এক তকমা জোটে সরকার বিরোধী কাজ করলে। চোখে আঙুল দিয়ে সরকারের ভুল ধরিয়ে দিতে গেলে। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, বহু বছর কেটে গেছে, গঙ্গা দিয়ে অনেক জলও গড়িয়ে গেছে, কিন্তু বদল? বিন্দুমাত্র হয়নি। 

     

    তবে তারুণ্য যে বাঁধা মানে না। তারুণ্য যে এক উদ্দীপনার, সাহসের সময়। তার কাছে যা ভুল, যা বেঠিক সে সবটা পাল্টে দিতে চায়। জয়িতারাও চেয়েছিল। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সমাজ, সরকার দেখলে কার না রক্ত গরম হয়ে ওঠে? খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, এভাবে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করে যে বেশি দূর চলা যাবে না তা কি আমরা জানি না? নেতারা নিজেদেরটা বুঝে  নিচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ? তাদের কথা কে ভাবছে? এসব দেখেই তো বদলে দিতে ইচ্ছে করে পৃথিবীটাকে। কিন্তু ক্ষমতা কতটুকু আমাদের? তাই তো থেমে যাওয়া, মেনে নেওয়া। তবে সবাই যে মেনে নিতে পারে না। যুবদল গর্জে ওঠে বারেবার। কিন্তু তাদের যেন সুদীপ-কল্যাণ না হয়ে উঠতে হয়। দুর্বৃত্তদের রক্তে হাত রাঙিয়ে যেন সমাজকে সংশোধন না করতে হয়।  তাহলে যে তাদেরও স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে হবে ভাল কিছু করতে চাওয়ার পরিণামে। তখন সমাজকে কে বদলাবে? কে স্বপ্ন দেখবে? সমাজ বদলের স্বপ্ন যে ওদের মতোই তখন অধরা থেকে যাবে। 

     

    সমরেশ মজুমদারের লেখায় বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছে বারংবার। কিন্তু এই উপন্যাস আজও ভীষণ রকম প্রাসঙ্গিক থেকে গিয়েছে, কারণ ভঙ্গুর এই সমাজকে নতুন করে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে বইটি। বুঝিয়ে দেয় একাল সেকালের মধ্যেও কতটা মিল আছে। সমাজ বদলালেও সমাজের চরিত্র বদলায় না কখনও। তাই ঘুণে ধরা সমাজকে যদি সত্যি বদলাতে চাওয়া হয় তবে তার মানসিক পরিবর্তনের দরকার। দু চারজন মিলে গুটিকয় ব্যক্তিকে শায়েস্তা করে শোরগোল ফেলতে পারলেও গোটা সমাজের বদল অসম্ভব। তখন শুধু "সন্ত্রাসবাদী' তকমা নিয়ে থেমে থাকতে হবে, স্বপ্ন পূরণ হবে না

     

     

    বই: গর্ভধারিনী

    লেখক: সমরেশ মজুমদার

    প্রকাশনা: মিত্র অ্যান্ড ঘোষ

     


    শুভস্মিতা কাঞ্জী - এর অন্যান্য লেখা


    পৃথিবীর বাইরেও এই প্রথম কোথাও, কোনও গ্রহে হেলিকপ্টার উড়বে এবং তার নেপথ্যে থাকবে একজন ভারতীয়। 

    বাঙালির সুপ্ত ইচ্ছের কথা বলল ঋত্বিকের

    পরিস্থিতি নাকি বয়স, কে আমাদের বড় করে তোলে? 

    উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে দিশাহারা মানুষ।

    বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব যেন মারণ উৎসব না হয়, তার চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদেরই করতে হবে।

    সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের পাশেই সংহতি আর মানবতার উজ্জ্বল ছবি বাংলায়।

    গর্ভধারিণী: একটি প্রজন্ম পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested