×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • ভোটে হার মানেই রাজনীতি বর্জনীয় নয়

    সঞ্চারী সেন | 16-05-2021

    প্রতীকী ছবি

    পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটের ফল ঈদের আগেই অনেককে অনেক খুশি এনে দিয়েছে। সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, প্রত্যক্ষ শত্রুকে মুখের মতো জবাব দেওয়া গেছে!


    এতটাই আনন্দ যে আমার রাজনৈতিক মতামত জানা সত্ত্বেও, আমি ব্যক্তিগতভাবে দুঃখে থাকতে পারি জেনেও, সেলিম ভাই একটি যন্ত্রবদ্ধ সংবাদ পাঠিয়েছেন এই মর্মে যে, নন্দীগ্রামে তৃণমূল সুপ্রিমোকে ইভিএম কারচুপি করে হারানো হয়েছে। সমর্থন এতটাই তীব্র, পরিসংখ্যান বলছে সামগ্রিক ভাবে পঁচাত্তর শতাংশ মুসলমান ভোট এবার তৃতীয় বারের জন্য জয়ী শাসকদলের বাক্সে গেছে।


    সেলিম ভাই কলকাতায় একটি নামকরা বইয়ের দোকান চালান, উচ্চশিক্ষিত, বিচক্ষণ অর্থাৎ দানিশমন্দ। এ শহরের উর্দু সাহিত্যপ্রেমী অনেকের বইয়ের জোগানদার, মুশকিল আসান।

     

    আরও পড়ুন: বামপন্থার সামনে এখন পথটা কী?


    তাঁর কাছেই পেয়েছিলাম এক সুফি পীরকে নিয়ে লেখা গ্রন্থ, সেই পীর তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন-

    ভালবাসো সবায়,
    ঘৃণা নয় কারো জন্য
    শান্তি যদি কথার কথা হয়
    কাজ হবে না কোনও।
    শুধুই ঈশ্বর আর
    ধর্মের কথা
    নিয়ে যাবে না তোমায়
    কোনওখানে,
    বরং প্রকাশমান করো
    সত্তায় নিহিত শক্তি তোমার
    বিভাসিত হোক সমগ্র আলোক
    তোমার অমর অস্তিত্বের।

    সেই সুফি পীরকে তৎকালীন দিল্লীশ্বরও সমীহ করতেন তাঁর নির্লোভ, গরিব দরদী দর্শনের জন্য। গরিব নওয়াজ নামে পরিচিত এই মহামানবের জীবদ্দশার প্রায় হাজার বছর পরেও  আজমীরে তাঁর সমাধিতে সশ্রদ্ধ সমাগম হয় মুসলমান, হিন্দু, শিখ, খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের। এই ভারতবর্ষে, এই আবহেও।


    শুধু মইনুদ্দিন চিশতির ভারতেই নয়, ইরানেও সুফি কবি রুমির সমাধিতে ধর্মনির্বিশেষে মানুষের ঢল। কারণ সুফি ধর্ম প্রেমের ধর্ম, তার প্রভাবেই এদেশে কয়েক শতাব্দী পর থেকে মরমীয়াবাদের প্লাবন, যে ঢেউ পুনরুত্থিত হয়েছিল গুরু রামানন্দের হৃদয় সঙ্গীতে, সে জলকল্লোলে মিলেছিল নানক, কবীরের দোঁহা। সুফিবাদের মর্ম মরমীয়াদের মরমে পশেছিল বলেই না ভারতবর্ষ আজও সম্প্রীতির দেশ!


    অথচ আজকাল শুনছি পীরজাদা মানে মৌলবাদী! মুসলমানের পরিচিতি সত্তার সংগঠন হলেই অচ্ছুত!


    কোনো এককালে ধর্মীয় মজলিসে বক্তব্য রাখবার সময়কার ধারণা যদি পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়েও থাকে, তবু তা অগ্রাহ্য করতে হবে! আমরা সাহিত্যপ্রেমী প্রগতিশীল বাঙালি পরম আহ্লাদে জর্জ বার্নার্ড শ-এর পিগম্যালিয়নউপন্যাসটি পড়ব, মনে মনে প্রোফেসর হিগিনস হয়ে গরিব ফুলওয়ালি মেয়েটির উচ্চবর্গীয় শ্রেণীর মুখে ঝামা ঘষে দেওয়াকে বাসনালিপ্ত তারিফ করব, ক্লাসলেস সোসাইটির জয়গান করে ফেনিল পানীয়ে চুমুক দেব, কিন্তু মূলস্রোতে তাদের ফিরে আসতে দেব না, যাদের আমরা অশিক্ষিত বলি, মৌলবাদী বলি, ক্রিমিনাল বলি! কারণ তারা অমনটি থাকলেই আমাদের প্রগতিশীল অহংবোধ স্ফুর্তি পায়, নিজেকে বিশিষ্ট ভেবে নিয়ে রাতের ঘুম আরামদায়ক হতে থাকে। কী অনায়াস দক্ষতায় সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে সকলে মিলে ভুলিয়ে দেওয়া গেল গুজরাতে ক্ষমতায় আসার অঙ্ক মেলাতে মুসলমানদের গণহত্যার চক্রী, অজাত মুসলমান শিশুকে মায়ের গর্ভ থেকে খুঁড়ে বার করে এনে লোফালুফি খেলেছিল যারা, সেই সব খুনিদের নেতা এবং ইশরাত জাহান - ফুলের মতো কিশোরীটিকে এনকাউন্টারেখুন করা পুলিশ দলের রক্ষাকর্তা নরেন্দ্র মোদীকে মুখ্যমন্ত্রী হবার পর অভিনন্দন জানিয়ে ফুলের তোড়া পাঠানোর ঘটনা! পাল্টা স্তবক এবারে পাঠানো হয়নি, এ নিয়ে অভিমানও তো দেখা গেল আবার!


    ভোলা তো যাচ্ছে না ক্ষমতায় আসার প্রয়োজনে বিজেপির মূল সংগঠন আরএসএসের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও, এবং বিনিময়ে গ্রামাঞ্চলে তাদের শাখা বিস্তারে অবাধ ছাড়পত্র দেওয়ার কৌশলকে। ভুলব কী করে, চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে এ রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শব্দটির অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু এসব কিছুই ভুলিয়ে দেওয়া গেল বলেই তো তেসরা মে উর্দু খবরের কাগজগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে লিখল, ‘মাগরিবি বঙ্গাল মে মমতা কী হ্যাটট্রিক’, ‘বঙ্গাল অপনী বেটি কে পাস’, ‘বঙ্গাল কে অওয়াম নে বিজেপি কো বাহার কা রাস্তা দিখা দিয়া
    অনেক বছর আগে এক বামপন্থী শ্রমিক নেতা মহম্মদ নিজামুদ্দিনের লেখা আত্মজীবনীমূলক একটি উর্দু গ্রন্থে একটা ঘটনার কথা পড়েছিলাম। 1946 সাল, কলকাতায় নির্মম দাঙ্গা শুরু হয়েছে।

     

    আরও পড়ুন: পূর্ব ভারতে কি ‘দলবদলু'ই ভরসা বিজেপির?

     


    নিজামুদ্দিন তখন নিতান্তই বালক। দেখলেন, তাঁর অঞ্চলে রাস্তার দুই প্রান্তে দুই সম্প্রদায়ের উন্মত্ত জনতা জড়ো হয়েছে (এখানে এ কথা উল্লেখ করা সবিশেষ প্রয়োজন, এদের মধ্যে  বঙ্গভাষী কেউ ছিল না), সংঘর্ষ বাঁধা শুধু সময়ের অপেক্ষা।


    এমন সময় সেখানে ঠিক যেন ফরিশতার মতো এসে দাঁড়ালেন একদল মানুষ, দুই সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধি তাঁরা, কথা বললেন দুদিকের মানুষজনের সঙ্গেই। ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, তারপর আর সেখানে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়নি‌। নিজামুদ্দিন পরে জেনেছিলেন ওই মানুষেরা ছিলেন কমিউনিস্ট।


    গান্ধীজির আপ্রাণ সম্প্রীতি রক্ষার লড়াই, নোয়াখালি অভিযান, বেলেঘাটায় অনশন, কোনও বাঙালির পক্ষেই কি ভোলা সম্ভব! সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতায় এই গভীর মূলগত ঐক্য সত্ত্বেও কংগ্রেসের সঙ্গে কমিউনিস্টদের জোট হতে পারে না? বিশেষ করে সেটা যখন ক্ষমতালাভের  লালসায় এবং ক্ষমতালাভের পরেও বিজেপি-র তীব্র সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডার বিরোধিতার প্রশ্নে?
    ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আত্মসমর্পণকারী শক্তি তৃণনূল কংগ্রেস এর চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য? যখন পরিচিতি সত্তার রাজনীতি এমন ব্যাপক, যখন এমনকি দলিত হতে দলিততর ভাগে ভাঙা হচ্ছে মানুষকে, তখন হায়দরাবাদের ইসলামী শক্তির হাতে বিক্ষুব্ধ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে (হোন না তাঁরা তৃণমূল দল দ্বারা প্রত্যাখ্যাত) ছেড়ে দেওয়া বিবেচনার কাজ হত কি? এতে আখেরে লাভ হত কার? কে উপকৃত হয়েছে বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচনে?


    আমার মতো সাধারণ বামপন্থী রাজনৈতিক দর্শনসম্পন্ন অনেক মানুষ এই মুহূর্তে অসংখ্য প্রশ্নে দ্বিধাদীর্ণ। আমরা শুনেছি খাঁটি বনাম মেকি বামপন্থীর তত্ত্ব, আমরা দেখেছি পরিস্থিতি অনুযায়ী কমিউনিস্ট দলগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, আমরা দেখেছি হয়তো তীব্র আবেগের কারণেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে কমিউনিস্টদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরম্পরা।

     

    আরও পড়ুন: মেরুকরণের শাখা পল্লবিত হল না বাংলায়


    কোথাও বোধহয় একটা সর্বজ্ঞতার প্রবণতা, শেষ কথা বলে দেওয়ার ঝোঁক আজও কাজ করছে মেধাবী, অগ্রণী, চিন্তাশীল বাঙালি মননে। এটি বাংলার ভবিষ্যতের পক্ষে শুভ নয় একথা স্বীকার করবার সাহস আশা করি এই অংশের বাঙালির আছে।


    এবং আশা করি এ কথাও কেউ অস্বীকার করবেন না যে, এই নির্বাচনী খণ্ডযুদ্ধে জয় কারও কারও আত্মশ্লাঘায় আরাম দিলেও আখেরে কর্মহীন শ্রমিক, ভবিষ্যতহীন যুব সম্প্রদায় এবং মানহারা মানবীর জীবনে তা কোনও সুরাহা এনে দেবে না!


    নিরাশা, প্রশ্নের মাঝে দুঃখ আছে, আনন্দও কি নেই! দুঃখ, বন্ধু আজহার আলম, নাটকের প্রিয় মানুষটিকে মহামারী নিয়ে চলে যাওয়ার কারণে। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়েসের মধ্যেই করা অনেক নাটক, মান্টোকে নিয়ে, গালিবকে নিয়ে, কবীরকে নিয়ে। আনন্দের কথা, সেসবই রয়ে যাবে। রয়ে যাবে আজহার অভিনীত সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রযোজিত চলচ্চিত্রটি।
    তার চেয়েও আনন্দের কথা, বেঁচে থাকবে আজহার আর উমার প্রেম। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু এবং হিন্দি বিভাগের এই দুই ভিন্নধর্মী নাট্যমোদী ছাত্র-ছাত্রী মিলে ঠিক করেছিল সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী নাটক করবে। সেই আবেগ পরে আলিঙ্গন করেছিল পারস্পরিক প্রেমকেও। ওদের পরবর্তী প্রজন্মের শিরা উপশিরায় বইবে সে প্রেম।
    এরাই ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ, ওদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাই এখন ব্যক্তিগত দুঃখ, সুখ, সমৃদ্ধি ভুলে আর্ত মানুষের সঙ্গে। ওদের হাতেই বামপন্থী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।

     

    আরও পড়ুন: ভোটের হিসেব না কষে মানুষের পাশে রেড ভলেন্টিয়ার্স

     

    ওদের কন্ঠেই শুনতে পাই মখদুম মহিউদ্দিনের লেখা স্বপ্নের গান,

    লো সুর্খ সবেরা আতা হ্যায়
    আজাদী কা আজাদী কা
    গুলনার তরানা গাতা হ্যায়
    আজাদী কা আজাদী কা-
    সুরতরঙ্গিয়া গায় বিহঙ্গম,স্বাধীন ঊষাকাল সূর্য রক্তিম!


    কে বলতে পারে এই মূলস্রোতে মিলবে না অন্য স্রোতোধারাও!


    ওদের দিকে তাকিয়েই নির্দ্বিধায় বলতে পারি, "মুস্তকবিল মুবারক


    শুভ হোক আগামী দিন।


    সঞ্চারী সেন - এর অন্যান্য লেখা


    বাংলায় ভোটবাক্স ভরাতে বাংলার সাহিত্যিকদের লেখাকেই ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করছেন রাজনীতিকরা।

    চিড়া খাইতে পারুম না ... কী ZE কয় !

    আমাদের ছোটবেলায় জন্মদিনে বই দেওয়ার প্রথা ছিল

    আজও বাস্তব গালিবের সাধের দিল্লীর বিশেষ বিশেষ মহল্লার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা।

    বহুকাল রয়েছি এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে/ বিচ্ছেদরজনী যদি রাখি গণনাতে

    বুলডোজার চালিয়ে দুষ্কৃতী দমনের কথা বলে ভোটে জিতলেন উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ।

    ভোটে হার মানেই রাজনীতি বর্জনীয় নয়-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested