×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বিচিত্রকর্মা বিধানচন্দ্র

    শুভাশিস মৈত্র | 11-08-2022

    বিচিত্রকর্মা বিধানচন্দ্র

    বন্দেমাতরম: জওহরলাল বনাম বিধানচন্দ্র

    বন্দেমাতরম না জনগণমনঅধিনায়ক, কোন সঙ্গীতটি দেশর জাতীয় সঙ্গীত হবে তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে বিধান রায়ের একটি পত্র-তর্ক হয়েছিল। সরোজ চক্রবর্তীর লেখা মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বইয়ে এর বিবরণ রয়েছে। তর্কের আংশিক উদ্ধৃতি এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটা ছিল এই রকম: 1948 সালের 14 জুন, বিধান রায় জওহরলালকে চিঠিতে লেখেন, ‘... বুঝতে পারছি না, জাতীয়-সঙ্গীত হিসেবে ‘জনগণমন’ ব্যবহার করা আপনার নির্দেশ, না কি, এ বিষয়ে আপনি আমাদের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। যদি মতামতের প্রশ্ন হয়, তাহলে বলতে পারি,  জাতীয়-সঙ্গীত হবার ব্যাপারে ‘বন্দেমাতরম’-এর দাবি যে অনেক বেশি, সেটা বিবেচনা করে দেখা উচিত। নির্ধারিত মান অনুযায়ী এর সুর করা যেতে পারবে আর তা বাজাতে সময় লাগবে 45 সেকেন্ড থেকে এক মিনিট। কিন্তু এসব ছাড়াও দেখা উচিত, জাতীয়-সঙ্গীতের পিছনে কোনও ঐতিহ্য আছে কিনা। বন্দেমাতরমের তা আছে। 1905 সাল থেকে আত্মদান নিপীড়নের এক মহান ঐতিহাসিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এর পিছনে। ব্রিটিশ আমলে সরকারি আদেশ ভাঙার জন্য মানুষ এই গান গেয়ে উঠত আর তার জন্য অবলীলায় শাস্তি ভোগ করত। মানুষ জেলে গেছে, বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে, ফাঁসীর মঞ্চে উঠে গেছে এই গান কণ্ঠে নিয়ে। আমরা নিশ্চয় বলতে পারি জনগণমন-এর পিছনে তেমন কোনও ঐতিহ্য নেই। ...রবীন্দ্রনাথের উপর আমাদের বিপুল শ্রদ্ধা ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা একযোগে বলেছেন, বন্দেমাতরমই জাতীয়-সঙ্গীত হওয়া উচিত’।

     বিধান রায়ের এই চিঠির জবাবে জওহরলাল লিখলেন, ‘...জাতীয় সঙ্গীত কী হবে সেটা যে আইনসভাই স্থির করবে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বন্দেমাতরমের ব্যাপারে কয়েকজন মুসলমান যে আপত্তি করেছেন, সেটাও কোনও কাজের কথা নয়। চিন্তাটা এখানকার অনেককেই প্রভাবিত করতে পারেনি। কিন্তু...এখনকার পরিস্থিতিতে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’ একেবারেই খাপ খাচ্ছে না। বন্দেমাতরম আমাদের জাতীয়-ভাবোদ্দীপক গান হিসেবে এখন কেন, চিরকালই মর্যাদা পাবে, কারণ এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় সংগ্রাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু যে গান জাতীয় সংগ্রাম আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন বন্দেমাতরম করেছে, তার সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতের কিছুটা তফাৎ আছে। জাতীয় সঙ্গীত এমনই হবে, যাতে জয়ের কথা থাকবে, আশা পূরণের কথা থাকবে, অতীতে কী সংগ্রাম করা হয়েছে, তার কথা নয়। জাতীয় সঙ্গীত হচ্ছে প্রধানত সঙ্গীত... এর এমন একটি সুর থাকা দরকার যার লালিত্য থাকবে, যা তালে তালে গাওয়া যায়। ...গত অক্টোবরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ওয়ালডরফ-অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে এটা বাজানো হয়েছিল। সঙ্গীতে একটা সাড়া পড়ে গিয়েছিল। বিদেশি অতিথি যারা এসেছিলেন, তাঁরা বলেছিলেন, এমন সুন্দর জাতীয়-সঙ্গীতের সুর তাঁরা কখনও শোনেননি। ...আমরা বহু নামকরা সঙ্গীত বিশারদদের পরামর্শ নিয়েছি, তার মধ্যে বিদেশের সব থেকে বড় অর্কেস্ট্রা পরিচালকও কেউ কেউ আছেন। ...আসলে অর্কেস্ট্রা বা মিলিটারিতে বাজানোর পক্ষে বন্দেমাতরম তেমন জুতসই হচ্ছে না। ‘জনগণমন’-এর এমন একটা লালিত্য তাল আছে যা জাতীয় সঙ্গীতের পক্ষে খুবই উপযুক্ত। ...জানি না (শেষ পর্যন্ত আইনসভায়) জনগণমন-কে গ্রহণ করা হবে কিনা, তবে ‘বন্দেমাতরম’কে নেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। তাছাড়া কথার দিক থেকে দেখতে গেলেও বন্দেমাতরমের ভাষা বেশির ভাগ লোকই বুঝতে পারবে না, আমি তো নয়ই’। 

    জওহরলালের এই চিঠির উত্তরে বিধান রায় লিখলেন, ‘জাতীয়-সঙ্গীত নিয়ে লেখা চিঠি খুব মন দিয়ে পড়লাম। আমি এই নিয়ে দক্ষ মতামত দিতে পারি না। যদিও সুদূর অতীতে একসময় আমি যন্ত্রসঙ্গীত নিয়ে কিছু নাড়াচাড়া করেছিলাম। সে যাই হোক... চিঠির তৃতীয় প্যারাগ্রাফে যে যুক্তি আপনি দেখিয়েছেন, তার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। বন্দমাতরম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং গান জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে অযোগ্য বলে আমি  মনে করি না। বরং গান ভবিষ্যৎ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছে, ভারতবর্ষ যা হবে, শক্তিশালী এক দেশ, সমৃদ্ধশালী এক দেশ, সুজলা এবং সুফলা, বিজয়ের প্রতীক, প্রত্যাশা পূরণের প্রতীক। আসলে পুরোনো দিনের সংগ্রামের কোনও কথাই এতে নেই’।

    এর পর বিধান রায় ওই চিঠিতে লিখেছিলেন, জওহরলাল যে হোটেলে জনগণমন গাওয়া এবং বিদেশিদের ভাল লাগার কথা লিখেছিলেন, তাঁর মতে, ওখানে বন্দেমাতরম বাজালে শ্রোতাদের যে আরও বেশি সেটা ভাল লাগত না, সে কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়! তাঁর আরও প্রশ্ন ছিল, ঠিক মতো সুর করলে বন্দেমাতরমও তালে তালে গাওয়া সম্ভব। শব্দ বুঝতে না পারার প্রসঙ্গে বিধান রায় লিখেছিলেন, ওই অসুবিধে জনগণমন-র ক্ষেত্রেও খাটে।

    বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন সম্পাদনা করেছিলেন 1872-1876। এই সময় একবার তিনি টানা আট মাস ছুটি নিয়ে নৈহাটির কাঁটালপাড়ায় নিজের বাড়িতে ছিলেন। তখনই বন্দেমাতরম লেখা বলে মনে করা হয়। আনন্দমঠ লেখা তার পরে। বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিক প্রকাশিত হওয়ার পর 1882তে আনন্দমঠ বই প্রকাশ। আনন্দমঠে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ওই গান। বঙ্কিমচন্দ্র সম্ভবত অনুমান করেছিলেন, বন্দেমাতরম একদিন পরাধীন ভারতে মন্ত্রসঙ্গীত হয়ে উঠবে।

    সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘নির্বাচিত ধ্রুবপদ’, প্রথম খণ্ডে ‘বন্দে মাতরম’-এর সুর: উৎস বৈচিত্র নামের প্রবন্ধে অনন্তকুমার চক্রবর্তী লিখে্ছেন, ‘নিজের কন্যাকে তিনি (বঙ্কিমচন্দ্র) একবার বলেছিলেন, ‘একদিন দেখিবে- বিশ ত্রিশ বৎসর পর একদিন দেখিবে এই গান লইয়া বাঙালা উন্মত্ত হইয়াছে- বাঙালী মাতিয়াছে’।

    হরপ্রসাসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন, বঙ্কিমের নৈহাটির বাড়িতে সাহিত্যিকদের যে আড্ডা বসত সেখানে একদিন বঙ্কিম বন্দেমাতরম পড়ে শোনান। হরপ্রসাদ লিখছেন, “যেদিন তাঁহার দরবারে বসিয়া সর্বপ্রথম বন্দেমাতরম গান শুনিলাম, গানটি কাহারো মনে ধরিল না। একজন বলিলেন, ‘অত্যন্ত শ্রুতিকটু হইয়াছে’ । ‘শস্যশ্যামলাং’ শ্রুতিকটু নয়তো কী? ‘দ্বিসপ্তকোটীভূজৈর্ধৃতখরকরবালে’ ইহাকে কেহই শ্রতিমধুর বলিবে না। একজন বলিলেন, ‘কে বলে মা তুমি অবলে’ অবলের এ-কার না ব্যাকরণ, না কিছু। বঙ্কিমচন্দ্র এই কথাগুলি এক ঘণ্টা ধরিয়া ধীরভাবে শুনিলেন, তাহার পর বলিলেন, ‘আমার ভালো লেগেছে, তাই লিখেছি। তোমাদের ইচ্ছে হয়  ফেলে দাও, না-হয় প’ড়ো না’।    

     1894-র 8 এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু। আনন্দমঠ প্রকাশের 14 বছর পর 1896 সালে কলকাতার বিডন স্কোয়ারে, এখন যেটা রবীন্দ্র কানন, সেখানে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল। সেখানেই রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন বন্দেমাতরম গান। ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, কেউ কেউ নাকি সে গান শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় শোনা গেল বন্দমাতরম স্লোগান। যাকে বলা হল দেশাত্মবোধের বীজমন্ত্র।

    তবে বন্দেমাতরম না জনগণমন, এই বিতর্ক অনেক দিন চলেছিল। অবশেষে, স্বাধীনতার প্রায় দু’বছর পর, 1949 সালের 26 নভেম্বর সংবিধান রচনার কাজ শেষ হওয়ার দু’মাস পরে 1950 সালের 24 জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘The composition of the words and music known as Janaganamana is the National Anthem of India subject to such alteration in the words as the government may authorise as occasion arises; and the song Vande Mataram which has played a historic part in the struggle for Indian freedom shall be honoured equally with  Janaganamana and shall have equal status with it. I hope this will satisfy the members’.

    এইভাবে ‘বন্দেমাতরম’ রাষ্ট্রীয় সংগীতের সমমর্যাদা পেল। সংবিধানে এর কোনও উল্লেখ নেই, তবে গণপরিষদে সর্বসম্মত স্বীকৃতির রেকর্ড অবশ্যই আছে।    

    আরও একটা কথা এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। বঙ্গদর্শনে যখন আনন্দমঠ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তখন ‘বন্দে’ এবং ‘মাতরম’ ছিল আলাদা দুটো শব্দ। আনন্দমঠ উপন্যাসের পঞ্চম সংস্করণ পর্যন্ত সেটাই ছিল। তার পর থেকে হয় একটি শব্দ, ‘বন্দেমাতরম’।

     

    বিধান রায়ের উপহার গ্রহণ

    1956 সালে 3 জুলাই ভারতে এসেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান দুই নেতা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিকোলাই বুলগানিন এবং সেই সময়ের সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতা, সাধারণ সম্পাদক নিকিতা ক্রুশ্চেভ। এই উপলক্ষে কলকাতার ব্রিগেডে জনসভা হয়েছিল, তাকে এখনও বলা হয় ব্রিগেডের সব থেকে বড় জনসভাগুলির মধ্যে অন্যতম। কত মানুষ এসেছিলেন? কারও মতে পাঁচ লক্ষ, কেউ বলেন দশ। সভা উপলক্ষে ব্রিগেডের মঞ্চে সেদিন ওই দুই সোভিয়েত নেতা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। জনসমাবেশ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন দুই সোভিয়েত নেতা।

    এই সভার পরের দিন ক্রুশ্চেভ এবং বুলগানিনকে নিয়ে গঙ্গায় লঞ্চে করে বিধান রায় গেলেন শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখাতে। রাতে হল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নৈশ ভোজ। লঞ্চে যাত্রাপথে দুই সোভিয়েত নেতার সঙ্গে বিধান রায়ের যে কথা হয়েছিল, সে কথা পরে তাঁর কাছে শুনে অশোককৃষ্ণ দত্ত লিখেছিলেন ‘এক মহান ব্যক্তিত্ব’ রচনাটি। যা পরে নথিবদ্ধ করেন অশোককুমার কুণ্ডু তাঁর ‘ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়’ জীবনী গ্রন্থে। মাঝ গঙ্গায় বিধান রায় সোভিয়েত নেতাদের লঞ্চ থেকে শহর দেখাতে দেখাতে লন্ডন, নিউই্য়র্ক, হামবুর্গ ইত্যাদি শহরে টেমস বা হাডসন বা এলবে নদীবক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির সঙ্গে কলকাতার তুলনা করছিলেন। এসব শুনতে শুনতে ক্রুশ্চেভ হঠাৎ বললেন, ‘আপনি তো শুধুই ক্যাপিটালিস্ট দেশের সঙ্গে তুলনা করছেন, কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশের কথা তো বলছেন না’! বিধান রায় হেসে বললেন, ‘আমি তো ওই সব দেশেই গিয়েছি। আমি তো কখনও কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশ দেখিইনি’। ক্রুশ্চেভ তা শুনে বললেন, ‘কেন যাননি কেন’? বিধান রায় জবাবে বললেন, ‘ ওরা আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাই গিয়েছি। আমাদের অত বিদেশি মুদ্রা নেই যে বিদেশে বেড়াতে যাব’। তা শুনে ক্রুশ্চেভ হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আপনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আসুন, যত দিন খুশি থাকুন, দেখুন আমরা কেমন কাজ করছি’। বিধান রায় হেসে বললেন, ‘বড্ড দেরি করে ফেলেছেন আপনারা। এত বয়েসে আর কি যাওয়া হয়। কবে মরে যাব’। ক্রুশ্চেভ গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘ আমাদের দেশে যদি মারা যান,  লাল ফৌজ কুচকাওয়াজ করে আপনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করবে’। এই বার বিধান রায় হেসে বললেন, ‘না না আমি কোনও গডলেস কান্ট্রিতে মরতে চাই না’। ক্রুশ্চেভ অবাক হয়ে বলেন, ‘সেকি! ডাক্তার, তুমিতো বিজ্ঞান মানো আবার ঈশ্বরও মানো? দেখেছ কখনও ঈশ্বরকে’? বিধান রায় বললেন, ‘আপনি কি কখনও বিদ্যুৎ দেখেছেন’? ক্রুশ্চেভ বললেন, ‘না তা দেখিনি, কিন্তু সেই শক্তির প্রভাবে এই লঞ্চ চলছে, ওই আলো জ্বলছে’, এসব হল ওই বিদ্যুৎ শক্তির ফলিত প্রকাশ। বিধান রায় বললেন,‘ আমিও সেই ফলিত প্রকাশ দেখেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’। এর পরও দু’জনে অনেক আলোচনা হল ঈশ্বর নিয়ে। ক্রুশ্চেভ বিধান রায়ের সঙ্গে কথা বলে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে দেশে ফিরে তিনি বিধান রায়ের জন্য একটি বিশেষ বিমান উপহার দিতে চাইলেন। বিধান রায় তাঁকে লিখলেন, ‘আমার কী আর এরোপ্লেন নিয়ে খেলার বয়স আছে! আপনি বরং আমাদের মেডিক্যাল কলেজের জন্য কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি পাঠান’। কিছু দিনের মধ্যেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে এসে পৌঁছেছিল সেই সব আধুনিক চিকিৎসার যন্ত্র-পাতি।যা স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল শিক্ষায় কাজে লেগেছিল। 

    জেলে বসে জার্মান ভাষা শিখলেন বিধান রায়

    পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে 1930 সালে ইংরেজ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন দিল্লি থেকে। তার পর তাঁকে আনা হয় কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। জেলে ওই সময় বন্দি ছিলেন বর্ধমানের এক গান্ধীবাদী শিক্ষক বিজয়কুমার ভট্টাচার্য। বিজয়বাবু লিখেছেন, তিনি বর্ধমান জেলে থাকাকালীন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ওজন কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। সর্ব ক্ষণ জ্বর থাকত। এই সময় তাঁকে আনা হয় আলিপুর জেলে।

    বিধান রায় জেলে এসেছিলেন প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় সশ্রম কারাদণ্ড চেয়ে নিয়েছিলেন জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। সাধারণত এটা করা যায় না, কিন্তু সম্ভবত বিধান রায়ের ব্যক্তিত্বের সামনে ওঁরা না বলতে পারেননি। ফলে ডাঃ বিধান রায়ের ডিউটি পড়ল জেলের হাসপাতালে। কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল জেলে রোগীদের মৃত্যুর সংখ্যা কমে গেছে। নিউমোনিয়া, টাইফায়েড ইত্যাদি কিছু কঠিন অসুখের ওষুধ জেলে থাকত না, সে সব বিধান রায় তাঁর দাদা সুবোধ রায়ের মাধ্যমে বাইরে থেকে নিজের টাকায় আনাতে শুরু করলেন। প্রায়ই দেখা যেত ছ’ফুট ছাড়ানো লোকটা স্টেথো গলায় দিয়া জেলের হাসপালে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন, পেছন পেছন প্রায় হাত জোড় করে চলেছেন জেলের সরকারি ডাক্তার।

    গান্ধীবাদী সেই শিক্ষক বিজয়কুমার ভট্টাচার্য লিখেছেন, “বিধানবাবু চেয়ারটা টেনে নিয়ে আমার বিছানার পাশে বসলেন। মিনিট কয়েক চেয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর অসুখ নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। মুখের দিকে তাকালাম। একটু যেন চিন্তিত বলে মনে হল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে মুখখানা আবার প্রফুল্ল হয়ে উঠল। হেসে বললেন, ‘কিছু না। সেরে যাবে।’ মনে হল এর মধ্যেই অসুখের সব কিছু বুঝে ফেলেছেন। বিজয়কুমার ভট্টাচার্য লিখেছেন, কোনও রোগীর চিকিৎসা শুরুর আগে বিধান রায় কিছু ক্ষণ সেই রোগীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।” সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে তিনি রোগ নির্ণয় করতেন। ওই জেল হাসপাতালে তখন 110 জন রোগী। বিজয়কুমার ভট্টাচার্য লিখেছেন, এক দিন জেলের ডাক্তার বঙ্কিমবাবু (উপাধি লেখেননি বিজয়কুমার ভট্টাচার্য) কোনও কারণে আসতে দেরি করছেন। বিধান রায় একাই এক এক করে 110 জন রোগীকে দেখলেন। বেশ খানিকটা পরে ছুটতে ছুটতে বঙ্কিমবাবু এসে হাজির। কাঁচুমাঁচু মুখে সশএম কারাদণ্ডের বন্দি বিধান রায়কে বলছেন, স্যার একটু দেরি হয়ে গেল। বিধান রায় হেসে বললেন, না না ঠিক আছে, রোগী আমি দেখে নিয়েছি, আপনি ওদের টিকিটগুলো আনুন, পথ্য আর ওষুধটা আমি বলে দিচ্ছি। বিজয়কুমার ভট্টাচার্য লিখেছেন, তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, আধঘণ্টা আগে দেখা 110 জন রোগীর প্রত্যেকের জন্য ওষুধ, পথ্য প্রায় মুখস্থ এক এক করে বলে গেলেন ডাঃ রায়।

    বিধান রায় জেলে থাকাকালীন পেয়ে গেলেন বন্দি কানাই গাঙ্গুলিকে। কানাইবাবু ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডক্টরেট করেছিলেন জার্মানি থেকে। খুব ভালো জার্মান ভাষা জানতেন। তিনি বরিশালের শঙ্কর মঠের স্বামী প্রজ্ঞানন্দের বিপ্লবী দলের সদস্য ছিলেন। পরে গ্রেফতার হন ব্রিটিশ পুলিশে হাতে। এই কানাই গাঙ্গুলির কাছে জেলের ভিতর বিধান রায় শুরু করলেন জার্মান ভাষা শেখা। এই নিয়ে কানাইবাবু লিখেছিলেন, ছ’মাস জেলে থাকাকালীন বিধান রায় একদিনও বাদ দেননি জার্মান শেখার ক্লাস। এবং যখন জেল ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তাঁর এই বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

    জেলে বিধান রায়ের খাবার আসত ওয়েলিংটনের বাড়ি থেকে। আলিপুর জেলে তখন সিনিয়র ডেপুটি জেলার ছিলেন অনিলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। সব রাজনৈতিক বন্দির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি থেকে খাবার এলে আগে তা ‘টেস্ট’ করে দেখবেন ডেপুটি জেলার। তার পর তা বন্দিকে দেওয়া হবে। এক রাতে অনিলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে বসে খবর পেলেন, বিধান রায়ের খাবার আসেনি। ছুটে গেলেন জেলে। গিয়ে দেখলেন, খাবার এসেছিল, কিন্তু তা এত সুস্বাদু ছিল যে টেস্ট করতে করতে সবটাই খেয়ে ফেলেছেন ডেপুটি জেলার। লজ্জার মাথা খেয়ে অনিলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বিধান রায়ের ঘরে গিয়ে সব জানালেন। বিধান রায় হেসে বললেন, আগে বললে তো আমি ওর জন্যেও খাবার পাঠাতে বলে দিতাম। অনিলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বিধান রায়কে বললেন, তিনি বিধান রায়ের বাড়িতে ফোন করে দিয়েছেন, নতুন করে খাবার পাঠানো হচ্ছে। সেই খাবার এল রাত 11টায়। বিধান রায় খেলেন। তার পর বাড়ি গেলেন অনিলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

    #BidhanChandraRoy #AzadiKaAmritmahotsav #Bengal_Since_Independence


    শুভাশিস মৈত্র - এর অন্যান্য লেখা


    স্বাধীন ভারতের প্রথম যুগে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের প্রভাব ছিল রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়েও

    সাবধান! বড়দা কিন্তু সব দেখছে!

    ছ’শো বছরের বাংলা পুঁথি, দলিল, দস্তাবেজ, বই, পত্র-পত্রিকা, নথি ইত্যাদি থেকে সংগৃহীত এই শব্দ সম্ভার।

    বিচিত্রকর্মা বিধানচন্দ্র-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested