×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বিপাকে পড়ে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’

    বিতান ঘোষ | 03-06-2021

    প্রতীকী ছবি।

    তিনি কি বৃদ্ধ হলেন? তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের বয়স যখন মাত্র 7 বছর, তখনই কি তাঁর অকাল বার্ধক্য ধরল? বৃদ্ধ বয়সে বৈরাগ্য আসে। তাঁর দাবি অনুযায়ী যদিও তিনি আজন্ম বৈরাগী। বৈরাগ্যের কথা আসছে এই কারণে যে, বৈরাগ্য জাগলে মানুষজনের মনের প্রসার বাড়ে, অহং বোধ কমে আসেপ্রবলভাবে আমিত্ব ব্যাধিতে ভোগা মানুষও "আমাদের' বলতে শেখে 

     

     

    প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোভিড যুদ্ধে লড়ছে সারা দেশ। কিন্তু এতকাল তো ভূ-ভারত জানত লড়ছেন শুধু প্রধানমন্ত্রীই। তাঁর পারিষদরা এই কিছুকাল আগেও বলেছেন, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটা নাকি জেতা হয়ে গেছে, এবং এই লড়াইয়ের "ম্যাচ উইনার' এক এবং অদ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। নিন্দুকদের অবশ্য দাবি পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই নিজের কাঁধ থেকে যাবতীয় দায় ঝেড়ে ফেলে উনি "এক' থেকে "বহুজন' হয়েছেন। 2014 সালের পর গত 6 বছর ধরে তাঁর সরকারের বর্ষপূর্তি ধুমধাম করে হলেও এবারে তেমন কিছু হয়নি। তার একটা কারণ যদি হয় চলমান কোভিড পরিস্থিতি, অন্যটা অবশ্যই সরকারের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। এমন বহুমুখী সংকটে নরেন্দ্র মোদী সরকার কখনও পড়েনি, যা থেকে পরিত্রাণের আশু উপায় তাদের জানা নেই।

     

     

    2016-তে নোট বাতিলের পর কালো টাকা উদ্ধারের খোয়াবে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের যাবতীয় রাগ গলে জল হয়ে গিয়েছিল।  2019-এ কাশ্মীরে 370 ধারার বিলোপে বাকি ভারত ভেবেছিল ‘অবাধ্য’ কাশ্মীরকে এবার বাগে আনা যাবে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে এখন নিজের রাজ্যেই একই স্বৈরাচারের শিকার, সাংবিধানিকবাবে যাবতীয় ক্ষমতা হারিয়ে তাঁর পদটিই যাবদীয় গুরুত্ব হারিয়েছেলোকসভা নির্বাচনের আগে বালাকোটে এয়ারস্ট্রাইক জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দেশবাসীকে। সেই স্রোতে ভেসে গিয়েছিল মহারাষ্ট্রের কৃষকদের লং মার্চ, রাফাল ‘কেলেঙ্কারি’, রাহুল গান্ধীর স্বপ্নের ‘ন্যায় প্রকল্প’ সহ আরও অনেক কিছু। স্থানীয় রাজনীতিতেও কখনও উত্তরপ্রদেশের জাঠ-মুসলিমদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে, কখনও হরিয়ানার জাঠ, অ-জাঠ দ্বন্দ্বের যাবতীয় রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে বিজেপি। 

     

     

    উনুনের আঁচ নিভন্ত হয়ে এলে তাতে বাতাস দিলে তা গনগনে হয়ে জ্বলে ওঠে। বিজেপির রাজনৈতিক দর্শন অনুযায়ী এই গনগনে আগুন জ্বালিয়ে রাখার একটা দায় তাঁদের থাকেই। বিজেপি জানে তাদের কারা ভোট দেয় আর কারা দেয় না। তারাই বোধহয় ভারতের একমাত্র দল, যারা তাদের ভোট দেয় না, এমন ভোটারদের ভোটের প্রত্যাশাও তারা করে না। বরং যে অংশটা তাদের ভোট দেয়, তাদের আরও বেশি করে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। এই যোগ বিয়োগের খেলার মাঝে একটা ভাগ করতে হয়, আর তার জন্য মাঝেমধ্যেই আগুনের প্রয়োজন হয়। 2022 এর উত্তরপ্রদেশ ভোটের জন্য বিজেপি 2020-তেই রামমন্দিরের ভিত্তিস্থাপন করে ফেলেছে। কাশি বিশ্বনাথ মন্দিরকে ঘিরে বেনারসে মস্ত আয়োজন চলছে। কিন্তু তারপরেও কৃষক আন্দোলন, কোভিড মোকাবিলায় যোগী সরকারের ব্যর্থতা প্রভৃতি কারণে উত্তরপ্রদেশ দখলে রাখা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ মোদী-শাহের কপালে।

     

     

    বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ প্রায়ই বলতেন বামফ্রন্টের বিকল্প উন্নততর বামফ্রন্ট, অন্য কেউ নয়। তেমনি বিজেপি মুখে না বললেও কার্যত মনে করে হিন্দুত্বের বিকল্প উন্নততর হিন্দুত্ব। তাই এতকাল বিপদ বুঝলেই আস্তিন থেকে হিন্দুত্বের সেরা চালটা চেলে দিতেন মোদী-শাহ। কিন্তু এবারে পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে এই চমকে বিশেষ কল্কে মিলবে বলে মনে হচ্ছে না।

    আরও পড়ুন: লক্ষদ্বীপকে আরেকটি কাশ্মীর বানানোর চাল

     

    তাই বলে কি রণে ভঙ্গ দেবেন আমি থেকে আমরায় উত্তরণ ঘটানো প্রধানমন্ত্রী? মনে হয় না। এই দেশের মানুষ বড় দুর্বলস্মৃতির। ভোটের মাস ছয়েক আগের ঘটনায় অনেক পাশার দান উলটে যেতে দেখা গেছে বহুবার। করোনার প্রকোপ কমলেই এই আমরা নির্ঘাত আমিতেই নেমে আসবে। জনগণের কাঁধের বোঝা হালকা করে সাফল্যের যাবতীয় বোঝা প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে চাপিয়ে নেবেন। ওদিকে স্বাধীনতার 75 বছর উপলক্ষে ‘অমৃত মহোৎসব’-এর মঞ্চ প্রস্ততি চলছে। নির্মীয়মান সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের সামনে কোন রঙের পাগড়ি পরে মন কি বাত বলবেন প্রধানমন্ত্রী, জল্পনা চলছে তা নিয়েও। কিন্তু ততদিনে কোভিড পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি না হলে প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের একজন হয়েই থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক সংকোচন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্বলতম জিডিপির বৃদ্ধির ‘শিরোপা’য় ভূষিত হয়ে ইতিহাসে অমর হওয়া খুব মুশকিল। অথচ সেই আকাঙ্খা থেকেই নিজেকে নিয়ে এতটা মশগুল থাকেন প্রধানমন্ত্রী। 

     

     

    ইতিহাস সবার প্রতি সদয় হয় না৷ মোদীর পূর্বতন তা জানতেন বলেই বিদায়কালে বলে গিয়েছিলেন, 'আশা করি ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে।' বহুমূল্যের ইমারত গড়ে আর সযত্নে নিজের ভাবমূর্তি নির্মাণ করলেই ইতিহাস কারও প্রতি সদয় হবে, এমন কোনও কথা নেই। প্রধানমন্ত্রীকে আর একটু বৈরাগ্য দেখাতে হবে, দেশের দুর্দিনে নয়, সুদিনেও। আরও বেশি শুনতে হবে বিরোধী কন্ঠস্বর, আমিত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে ‘আমাদের’ মাঝেই থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে হয়তো ইতিহাসের কৃপাদৃষ্টি থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন না।


    বিতান ঘোষ - এর অন্যান্য লেখা


    ‘বাবু’দের দেখানো পথেই রাষ্ট্রদ্রোহীদের খুঁজছে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী।

    ‘সৃষ্টিছাড়া’ বাংলায় লক্ষ্মী-সরস্বতীও দিদি-বোন হয়ে যায়।

    বুকের মাঝে আস্ত একটা দেশকে যারা লালন করতে ব্যর্থ, তারাই ভাগাভাগির কথা বলে।

    আইনি ফয়সালা আদালতের অপেক্ষায়, কিন্তু নৈতিকতার পাঠ অসম্পূর্ণ রেখে কোন শিক্ষা দেবেন অঙ্কিতা

    স্বাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাস পদ্মফুল আর লেজার শো দিয়ে তারাই ঢাকতে পারে, যারা সেই সংগ্রামের শরিক নয়।

    পোশাক দেখে অপরাধী চিনে ফেলা ক্ষমতাসীনই, তার মতানুসারে চালাতে চায় সকলকে।

    বিপাকে পড়ে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested